Friday, 24 October 2014

চাঁদ ও নারীবাদ

সকালবেলাই বিপত্তি বার বার কেন যে ভুলে যাই - লক্ষ্মী পূজো পেরোলেই দুয়ারে টোকা মারেকড়ভ্বাচৌথ”! আজই ছিল সেই দিন স্বামীর মঙ্গলকামনায় সারাদিন জলস্পর্শ করবে না তার নারী সন্ধ্যেবেলা জাফরি-কাটা চালুনির ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখে বা থালায় রাখা জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি দেখে - স্বামীর মুখ দেখে - তারপর খাওয়া-দাওয়া ব্যাপারটা শুনতে যতই রোম্যান্টিক হোক না কেন - যথেষ্ট কষ্টকর আর তাই আজকের দিনে বর্তন-ওয়ালি, ঝাড়ু-পোঁছা-ওয়ালি, খানা-বানানে-ওয়ালি - কাঊকে আশা করা যাবে না সকলে যার যার স্বামী দেবতার জন্য ব্রতধারিণী - সে স্বামী ছাইপাঁশ যাই হোক না কেন! এদিকে আমি অফিসের কয়েকজনকে বাড়ীতে খেতে বলে ফেলেছি - তাই পড়েছি মহা আতান্তরে নিজের ওপরেই নিজে রেগে গেলাম এত বছর হয়ে গেল - তবু ভুলে যাই!
আসলে এই উৎসবটা আমার মেয়েবেলার ক্যালেন্ডারে ছিল না ষষ্টি, দ্বিতীয়া, পূর্ণিমা অনেক থাকলেও - ভারতের পূর্বপ্রান্তে, বিধান চন্দ্র রায়ের স্বপ্ন-সন্তান যে ছোট্ট ইস্পাত-নগরীতে আমি বড় হয়েছি - সেখানে এই চতুর্থীর চাঁদের বিশেষ মহিমা অজানা ছিল প্রথম নাম শুনেছিলাম দিল্লীতে চাকরি করতে এসে এক শুভানুধ্যায়ী বাঙালী বন্ধু খবরটা দিয়েছিলেন যে এই দিনটিতে নাকি সংসারী মানুষজনদের সংসারের মঙ্গলকামনায় বাসনকোসন কিনতে হয় - তাই প্রচুর সস্তায় প্রচুর কিছু কিনতে পাওয়া যায় বাজারে তা উনি যতো বলছেনকড়ভ্বাচৌথ” - আমি শুনছিগরবাচভ!” আর শুনে তো আমি মুগ্ধ! ১৯৯২ সাল আমি তো জানতামই না যে পেরেস্ত্রইকা শুধু মাত্র রাশিয়াতে নয় - দিল্লীতেও হয়ে গেছে! রুশের নেতার নামে একটা আস্ত পরব! পরবের দিন তো আর এক কেলেঙ্কারি! আমি এবং আমার স্বামী একই সংস্থায় চাকরি করি আমি জল খাচ্ছি - খাবার খাচ্ছি - এদিকে আমার একটা আস্ত স্বামী ঘুরে বেড়াচ্ছেন! এহেন অনাচার অনেকেই আমার কাছে আশা করেননি তবে কিনা সকলের আশানুরূপ কোন কাজটাই বা আমি করতে পারলাম কোনদিন?
প্রাইমারী স্কুলে পড়া-কালীন প্রেয়ারে “Oh God give us this day our daily bread” বলে বাড়ীতে এসে কোন কোন দিন মা-ঠাকুমার সঙ্গে ব্রতকথার গল্প শুনে সাবুমাখা খেতে মন্দ লাগত না গল্প শুনতে কোন বাচ্চারই বা খারাপ লাগে! মাঝে মাঝে সন্ধ্যবেলায় পড়া ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্মীর পাঁচালিও পড়তাম - “দোল পূর্ণিমার নিশা নির্মল আকাশ / মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় বাতাস” (মলয় আবার বাতাস - দূটোই ছিল কি?!) দুধ-সাদা জ্যোৎস্না আর মৃদু বাতাস ছাড়া বাকি গল্পটা মনে নেই - তবে ছন্দটা মনে আছে
ক্রমশঃ - কেমন করে ঠিক বলতে পারব না - মা লক্ষ্মী-সরস্বতী, দেবী দূর্গা - এদের প্রতি ভয়-ভক্তিটা একটু একটু করে কমতে কমতে মিলিয়ে গেল এনারা রইলেন - জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবেই থাকলেন - কিন্তু একটু অন্যভাবে সরস্বতী পূজো মানে মায়ের আগের পূজোর সিল্কের শাড়ীটা দুর্গাপূজো মানে মাসের পর মাস জুড়ে তাসের দেশ বা ঋতুরঙ্গের মহলা লক্ষ্মীপূজোটা ঘরোয়া ব্যাপার বাড়ীতে ঘটা করে পূজো হোক বা না হোক - আমি আমার আর্ট ক্লাসের সরঞ্জাম ছড়িয়ে সারা বাড়ী ভরে ফেলতাম আলপনায় - মা মনে হয় পাঁচালী পড়তেন রাত্রে খিচুড়ি - হয় নিজের বাড়ীতে নয় পাড়ায় কারো বাড়ীতে কোজাগরী পূর্ণিমা থেকে অমাবস্যা annual পরীক্ষার প্রস্তুতিতেই কাটত কালীপূজো মানে রাত জুড়ে ঠাকুর দেখে ভোরবেলা ভিড়িঙ্গী কালিবাড়ীতে ভোগ খেয়ে ক্লান্ত চোখে বাড়ী ফেরা আমার উৎসবের ক্যালেন্ডার মোটামুটি এখানেই শেষ হতো আমার নিজের ভাই নেই - তাই ভাই-ফোঁটার সাথে খুব একটা আত্মিক সম্পর্ক টের পাইনি কোনোদিন এই দিনটা মায়ের মনটা সামান্য খারাপ-খারাপ থাকত হঠাৎ কোন কোন দ্বিতীয়ার সকালে মামারা খবর না দিয়েই এসে পড়তেন ভিলাই বা কলকাতা থেকে - দিদিকে চমকে দিতে! মায়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত! ঘী-চন্দন-লুচির অনুষঙ্গে ফিরে আসত ভাই-বোনের হারানো সময় - আমাদের জন্য আরো একটা আনন্দঘন দিন
তবে স্কুলের ওপর দিকে উঠতে উঠতেই টের পাচ্ছিলাম দেব-দেবীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে না - বাড়ছে বলাটা হয়তো ঠিক হল না তেনারা ছিলেন - মঙ্গলকাব্যের আগে থেকেই ছিলেন - তবে তাঁরা সকলে সর্বত্র সমানভাবে প্রভাবশালী ছিলেন না কিন্তু কেন? লোকসংস্কৃতিরও তো একটা মূল্য আছে না কি? তাই সেই অন্যায়ের প্রতিবিধানে এগিয়ে এসেছিল চলচ্চিত্র জগৎ - সন্তোষী মা, বাবা তারকনাথ ইত্যাদি দেবদেবীর মহিমার উপেক্ষিত কাহিনী দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের আনাচে-কানাচে দেশে ভক্তির মিটার চড়তে লাগল ভক্তি আন্দোলনের এই নতুন সংস্করণে যে সব ঠাকুর-দেবতাদের নিয়ে চলচ্চিত্র হয়নি তাঁরাও লাভবান হলেন বিশ্বকর্মার উপাসকবৃন্দ কেবলমাত্র কল-কারখানার কর্মচারীতেই সীমাবদ্ধ রইল না দেবী জগদ্ধাত্রী চন্দননগরের বাইরে স্বীকৃতি পেলেন শনিদেব তাঁর নিজের নামে উৎসর্গীকৃত মন্দিরে বাসা করে স্বস্তির শ্বাস ফেললেন
এত দেব-দেবীর প্রাদুর্ভাব কি করে যে তখন আমার ওপর প্রভাব ফেলল না বুঝতে পারি না আসলে আমরা তো তখন ব্যস্ত - ব্যস্ত আচার-বিচারের বাঁধন ছিঁড়ে বেরোতেগোরাকিংবাদত্তালেখা হয়েছিল আমাদের জন্মের বহু আগে কিন্তু আমরা পড়তে পড়তে উদ্বেল হলাম ওদিকে আবারপ্রথম প্রতিশ্রুতিলেখা হল বাংলাদেশের অবজ্ঞাত অন্তঃপুরের নিভৃতে প্রথম যারা বয়ে নিয়ে গেছিলেন প্রতিশ্রুতির স্বাক্ষর - তার কাহিনী পড়ে অস্থির হলাম কলেজে পড়তে গেলাম আমার দোসর আমাকে জন্মদিনে উপহার দিলেন Simone de Beauvoir এর The Second Sex.
আমরা তখন প্রতিবাদী সরব না হলেও নারীপুরুষ অনেকেই আমরা নীরব প্রতিবাদী অনেক সময়ই সরব নই কারণ সরব হবার প্রয়োজন পড়েনি প্রথম সোচ্চার প্রতিবাদ বোধহয় বিয়ের পর আমি ঠিক বুঝতে পারিনি কেন আমাকে সিঁদুর-শাখা-পলা-লোহা সম্বৃত হয়ে সোচ্চারে বলে বেড়াতে হবেআমি বিবাহিত”! সরব নারীবাদীরা বলছিলেন কেন - শুধু মেয়েরাই কেন বিবাহের সমস্ত চিহ্ন বহন করবে! কেন নারীই শুধু উপবাস করবে ভাই, জামাই, সন্তানের শুভ-কামনায় তার জন্য কে আছে? এইসব নানাবিধ মন্ত্রণার প্রতিফলে আমি তো বিপ্লবী
সিঁদুরের ইতিহাস নিয়ে খানিক নাড়াঘাঁটাও হয়েছিল সুজনেরা বলতেন - সিঁদুর আগুনের প্রতীক সিঁদুরে তাই রয়েছে দেবী দুর্গার শক্তি দুর্জনেরা বলেছিলেন - বহু বহু বছর আগে শিকারি পুরুষ নিজের নারীকে চিহ্নিত করতে নিহত পশুর রক্ত লাগিয়ে দিতেন মাথায় - শত্রুকে সাবধান করতে - কারণ তারা অযথা মারামারি চাইতেন না!
ভাবলাম সিঁদুর নামক chastity-belt যদি বিবাহিত নারীদের সমাজের সব দুষ্কৃতি থেকে মুক্তি দিত - তাও নাহয় একটা কথা ছিল! আর সিঁদুর পড়লেই যে পরকীয়া রোখা যায় - তাও বিশ্বাস করার উপায় ছিল না! সুন্দরী চারুলতার ঘন কালো চুলের ফাঁকে লেলিহান সিঁদুরের রেখা - নাকের ওপর ঝরে পড়া গুঁড়ো গুঁড়ো সিঁদুরের লালিমা - তা দেখেই না ভূপতি, অমল দুজনেই কাত! মোদ্দা কথা - সরব-নীরব সবরকম নারীবাদীদের চক্করে সিঁদুর-মঙ্গলসূত্র ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছুই একটু back-seat চলে গেছিল কয়েক বছরের জন্য
কিন্তু পৃথিবী বিবর্তনশীল চক্রাকারে ঘুরে আসে সময় পুরাতনকে নতুন করে ফিরে পায় বা ফিরে পেতে চায় মানুষ তাই বোধহয় আচার-বিচার শুদ্ধাচারের প্রতি হৃক্ত ভালবাসা ফিরে আসে সমাজে ফিরে আসে নতুন সাজে আপাতত সময় যা কিছু দেশজ-ভেষজ তাকে আপন করে নেবার পুরনো বেনারসি শাড়ীর নকশার মতোই সিঁদুরের মহিমা পুনরাবিষ্কৃত হচ্ছে দশমীর সকালে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে লালপাড়-সাদা বেনারসি পরিহিতা লাবণ্যময়ী বঙ্গ-ললনাদের মুখ যখন সিঁদুরে রাঙ্গা হয়ে ওঠে - সেই শিল্পময় মূহুর্তের নান্দনিকতার আবেদন বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়াটা আজ ছোট হতে হতে গ্রামীণ বিশ্বলোক তাই আমি যে নাম শুনিনি - সেই ““কড়ভ্বাচৌথএখন পশ্চিমবাংলায় ঘরোয়া নাম শুনতে পাই সেখানে নাকি এই দিনটিতে একটু সোনা-দানা কিনে রাখার প্রথা চালু হয়েছে বোধ করি দুনিয়া মঙ্গলময় হয়ে উঠছে প্রার্থনা করি এই মাঙ্গল্যের সুর যেন পৃথিবীকে কলুষমুক্ত করে আমরা তো পারিনি

Top of Form



No comments:

Post a Comment