পূজো এবার অনেক আগে এসে পড়া সত্ত্বেও কালীপূজোর আগেই বাতাসে
হেমন্তের ছোঁয়া। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো
হঠাৎ কোলকাতায় তিন ঘণ্টা বকবক করার আমন্ত্রণ কোন মতেই ছেড়ে দেওয়া গেলো না। সংসারের
পাকে-চক্রে জড়িয়ে থাকতে থাকতে এমনি বদ অভ্যেস হয়ে গেছে - যে বিনা কারণে ছুটি নিতে প্রায়
ভুলেই গেছি। অনেক টানা-পোড়েনের শেষে কালজয়ী সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম - আমন্ত্রণের
সাথে দুটো দিন ছুটি জুড়েই দিই।
পূব আকাশ এখানে তাড়াতাড়ি ফর্সা হয়। মধুর সোমবার। চা খেতে খেতে
ইমেল দেখাটা সামলানো যায় না। ওপ্রান্তে অফিস শুরু হতে না হতেই দুচারটে ফোনে আমার সীটটা
আজ খালি থাকলেও যে ফাঁকা নয় সেটা প্রমাণ করে - সোনা সোনা রোদ্দুর মেখে গড়িয়াহাটে টই-টই।
কিছুটা কেনাকাটা - কিছুটা উদ্দেশ্যহীন। হকারদের জিনিস দরদাম করে, তাঁত-প্রিণ্ট-পিওর-সিল্ক
ছুঁয়ে ছুঁয়ে, খানিক এলোমেলো ঘুরে - অনেক দূরে ফেলে আসা অতীতের গন্ধ গায়ে মেখে বাড়ী
ফিরতে ফিরতে দুপুর দেড়টা।
উত্তর দক্ষিণ - যাওয়া যেত এদিক ওদিক অনেকেরই বাড়ী। কিন্তু টানছিল
“চতুষ্কোণ”। চারটে বাজতে না বাজতেই মাকে টানতে টানতে সাউথ সিটি। সময় বয়ে যায়, পরিপার্শ্ব
বদলে যায়, মানুষ বদলে যায় - আর সেই সব বদলের
মাঝখানে দাঁড়িয়ে মাথার ভেতরে ছায়াছবির মতো খেলা করে বহু বহু বছরের স্মৃতি। মাইলের পর
মাইল সাদা-কালো, সেপিয়া, টেরাকোটার রিলে এক একটা উজ্জ্বল গোলাপী মূহুর্ত।
আজ সকালে “আনন্দ”র দোকানে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ দেখি পঞ্চাশ
বছরের দেশের গল্প সংকলন - ১৯৩৩ থেকে ১৯৮৩। বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল। আনকোরা নতুন
বইটা তাক থেকে পেড়ে প্রথম পাতাটা খুলে দেখছি - “গোলাপের চেয়েও উজ্জ্বল, ভালোবাসার চেয়েও
সুন্দর, উত্তমা আমার উজ্জ্বল উদ্ধার!” বইটা কোথায় হারিয়ে গেছে! ইচ্ছে করল - খুব ইচ্ছে
করল বইটা কিনে নিয়ে গিয়ে বলি - “আবার লিখে দাও!” কিন্তু এত আলোকবর্ষ পেরিয়ে কোথায় পাব তাকে আজ?
আনোয়ারশাহ ফ্লাইওভারের
ধারে কদম ফুলের গাছগুলোও এবার সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলেছে। হেমন্তের আকাশ জুড়ে কদমফুলের
রেণু - বাতাসে ছাতিমের গন্ধ। চার দিকপালকে নিয়ে গল্প - “চতুষ্কোণ”। অপর্ণা সেনের মুখে
আমাদের ফেলে আসা সময়। আজকাল হিন্দুস্থান পার্কের মুখে মামাশ্বশুরের বাড়ীতে গেলে খালি
হাতে যাই না। মামী দরজা খুলে আঁতকে উঠলেন - “একিরে তোর এত সুন্দর চুল ছিল! কি অবস্থা
হয়েছে!” মাত্র ছ-মাস আগেই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তবে এমন বেহিসেবী সকালে না বলে-কয়ে
নয়। মামীমা বোধহয় দরজা খুলেই ভাবলেন এটা ১৯৮৯ কি ৯০। মামা বললেন - “আঃ ওরাও তো এখন
সিনিয়র সিটিজেন হবার পথে।”
দুদিন পর কালীপূজো। রবিবারের সকালে পাড়ার ক্লাব থেকে ভেসে আসছিল
ঘোষণা। যেমন আগেও হতো - কি বলছিল সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না - কিন্তু হাওয়ায় ভেসে আসা
মাইকের আওয়াজ ছোটবেলার স্মৃতি। সকালে বেরোনোর সময় দেখেছিলাম রাস্তাটা যানবাহনের জন্য
বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খানিকটা বিরক্তি থাকলেও চুপচাপ চলে গেলাম কাজে। দুপুরে রাস্তার অন্য প্রান্ত দিয়ে ট্যাক্সি
নিয়ে ঢুকতে গিয়ে দেখি - ওদিকটাও বন্ধ। অগত্যা হাঁটা। দুপুর ঢলে পড়ার মুখে। শীত আসতে
এখনো খানিক দেরী। শীতকালে এমন রোদ্দুর মেখে আমরা কমলা লেবু খেতাম। আজকাল ছ’তলায় বাড়ী
থেকে বেড়িয়ে লিফটে চড়ে সোজা বেসমেণ্টে গিয়ে গাড়িতে বসি। আবার বেসমেণ্ট থেকে লিফটে চড়ে
দশতলায় অফিসে ঢুকি। ডাক্তার বিশেষ ভাবে বলেছিলেন ত্বকে রোদ্দুর লাগাতে। এবড়ো-খেবড়ো
নোংরা রাস্তার বুকে খানিক দূর দূর বাসিন্দাদের জটলা। কাছে গিয়ে দেখি - চকখড়ি দিয়ে এক
একজন আঁকছে জোড়া-ময়ূর, গণেশ, কল্কা - আর তার সঙ্গী-সাথীরা তাতে রং ভরছে - তুঁতে, কমলা,
গোলাপী, হলুদ, লাল, বেগুনি। মুছে যাবে - মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুছে যাবে এই পরিশ্রম
জেনেও কারো ক্লান্তি নেই। বিপুল অধ্যাবসায়ে ফুটিয়ে তুলছে ময়ূরের পেখম, মৎস্যকণ্যার
ওড়না, প্রজাপতির পাখা। প্রাণ আছে এখনো প্রাণ আছে - প্রাণ আছে তাই প্রেম আছে।
“চতুষ্কোণে” এক নতুন
সঙ্গীতশিল্পীর আত্মপ্রকাশ। লগ্নজিতার গলায় “বসন্ত এসে গেছে” গানটা মাথার মধ্যে গেঁথে
গেল। পুরনো - আমাদের চেয়ে অনেক অনেক পুরনো দিনের গায়কী - সুরে এক অদ্ভুত একঘেয়ে দুলুনি
- যেন নিস্তরঙ্গ সময়ের বুকে মাঝে মাঝে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ। কোনটা যে সত্যি তা কেউ জানে না। পাওয়াটা সত্যি না হারানোটা
সত্যি? নাকি দুটোই? রং জ্বলে যাওয়া পুরনো শাড়ীর সুতোয় সুতোয় যেমন জড়িয়ে থাকে স্মৃতি।
চোখ বন্ধ করলে শুনতে পাই সেই সব কথা যা বলা হয়েছিল বা বলা হয়নি। কিছু কথা যা বলার প্রয়োজন
ছিল না। কিছু তার বোঝা গেছিল, কিছু হয়ত নয় - কিছু ভুল বোঝা। যে চেহারাগুলো আজ চোখের
সামনে আর যে চেহারাগুলো মনের গহনে - সেগুলো সবসময়ে মেলানো যায় না। সময়ের চোরাস্রোতে
বলা-না বলা সমস্ত কথাই ভেসে গেছে। তারা কি হারিয়ে গেছে - নাকি হারায়না কিছুই? বৃষ্টি-ভেজা কদমফুল তুলতে হেঁটে যেতাম
এক-এক মাইল। হেমন্তের সাতরঙা রোদ্দুরে - কদমফুলের হাসিতে বন্দী অনেক অনেক রং - যা এক
ঝলকের জন্য হলেও ডুবিয়েছিল রঙের সমুদ্রে। হৈমন্তী ঝড়ে ভিজতে ভিজতে টের পাই এখনো অনেকটা
পথ চলতে হবে - সাদাকালো অথবা সেপিয়া অথবা টেরাকোটা - মাঝে মাঝে বিদ্যুচ্চমকের মত একঝলক
উজ্জ্বল গোলাপী।

No comments:
Post a Comment