ফিরোজা বেগম চলে গেলেন। এক ঝুড়ি স্মৃতি নাড়াচাড়া করতে করতে তাঁর গান শুনছি
YouTube এ। আমার কাছে ফিরোজা বেগম মানে সদ্য-সমাপ্ত উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা, দুরুদুরু
বক্ষে Joint-entrance এর result এর জন্য অপেক্ষা করা - জীবনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নতুন এবং
পুরাতনের টানে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়া।
আমাদের বাড়ীতে রেকর্ড-প্লেয়ার ছিল না। বাবার একটা পেল্লায় American
(নাকি German?) স্পুল-টেপ রেকর্ডার ছিল - কিন্তু
তার রেকর্ডিং এর mechanism টা খারাপ হয়ে গেছিল - দুর্গাপুরে সারানো গেল না। তাই নতুন
কিছু তাতে সংযোজন করা যেত না। সাদা রঙের সেই অতি-সুন্দর
যন্ত্রটা চালালেই সারা বাড়ীতে আছড়ে পড়তো হেমন্ত
মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে - “তুই ফেলে এসেছিস কারে
মন মন রে আমার …।” এরপর গোটা কতক রবীন্দ্রসঙ্গীত দেবব্রত বিশ্বাসের গমগমে
গলায়। এছাড়া দুই স্পুল জুড়ে ছিল সেতার। বাবার প্রিয়। রবিশঙ্কর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়,
জয়া বিশ্বাস, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত - সক্কলের সেতার
বাদন বাবার রেকর্ড করা ছিল। মাঝে মাঝেই সন্ধ্যেবেলা কারখানা থেকে ফিরে ঘর অন্ধকার করে
বাবা রেকর্ড-প্লেয়ারটা চালিয়ে দিতেন। একটা স্বর্গীয় সবুজ আলো জ্বলত player টা চললে। চোখ বন্ধ করলে
এখনও শুনতে পাই - বাইরে বৃষ্টি পড়ছে একটানা - ঘরের ভেতর নীলচে-সবুজ অন্ধকারে ভেসে বেড়াচ্ছে দেশ রাগের আলাপ
- শুদ্ধ নিষাদ বেয়ে আরোহণ - কোমল নিষাদের মীড় আলতো করে ধৈবত ছুঁয়ে ফেরা।
বাবা নিজেও সেতার শিখেছেন
কিছুকাল। তারপর যখন প্রমাণিত হয়ে গেল যে গানটা আমার দ্বারা কিছুতেই হবে না তখন আমাকেও
ভর্তি করে দিলেন সেতারের ক্লাসে। কিন্তু মুশকিল হল আমার দ্বারা সেতারটাও হল না - সুর,
তাল, লয়, আঙ্গুল - সব একসাথে সামলানো বেশ দুরূহ কাজ। তবে সেতারের মাস্টারমশাই আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। বাজাতে পারতাম
না বিশেষ - তাই নবম শ্রেণিতে উঠে পড়াশুনোর দোহাই দিয়ে ক্লাসে যাওয়া ছেড়ে দিলাম। মাস্টারমশাই
বাড়ী চলে এলেন। উইকেণ্ডে আসতেন উনি আসানসোল থেকে। টানা চার বছর নিজের অসংখ্য গুণী ছাত্র-ছাত্রীদের শেখানোর ফাঁকে আমার জন্য এক ঘণ্টা সময় ঠিক বার করে নিতেন। যা পারি
বাজাতাম খানিক। তারপর গল্প। ওনার ছেলের বিয়ের
গল্প, মেয়ের শ্বশুরবাড়ির গল্প, রাগরাগিণীর গল্প - সবই হতো। মরমের কোন গভীরে গিয়ে সে
সব গল্প গেঁথে আছে তা টের পাই মালকোষ কিম্বা দরবারি কানাড়ার সুর যখন বুকের ভেতরটা তোলপাড়
করে দেয়। বয়স অল্প - তাই এই সাহচর্য্যের মূল্যায়ন করা সম্ভব ছিল না তখন।
করতে পারিওনি। এখন বড় লজ্জা করে। ঘরের কোনায়
পড়ে থাকা সেতারটা বয়ে বেড়ালাম এ-শহর, সে-শহর - শিখতে পারলাম না।
যাই হোক - কথা হচ্ছিল ফিরোজা বেগমের। তা বাড়িতে রেকর্ড-প্লেয়ার
নেই - রেডিওতে রবীন্দ্র সঙ্গীত তো শোনা যায় অনেক - নজরুল গীতি বাজত দশ মিনিট দশ মিনিট
করে। তাই ওই দুচারটে চেনা গান ছাড়া খুব একটা
জানতাম না। “রুম-ঝুম-ঝুম-ঝুম” আর “মোমের পুতুল” নাচ হতো পাড়ায় পূজোর সময়ে - এই মোটামুটি
আমার নজরুল গীতির পরিধি।
ক্লাস ইলেভেন - টুয়েলভে আমাকে বাড়িতে অঙ্ক করাতে এলেন আরেক মাস্টারমশাই।
দেখলাম যে মাস্টারমশাইদের সাথে আমার বিশেষ ভাব হয়ে যায় - তা সে পঞ্চান্ন বছরের সেতারের মাস্টারমশাই হোক বা আঠাশ বছরের অঙ্কের
মাস্টারমশাই হোক। এবং সে ভাবের আধার অনেক সময়ই মূল বিষয় ছেড়ে অন্যান্য কারণে।
দুবছর ধরে অঙ্ক যত হল - ততটাই হল সংগীত নিয়ে গল্প। হ্যাঁ - গল্পই
- কারণ দুজনেরই এক দুঃখ - গান গাইতে পারি না। সপ্তাহে দুদিন দুঘণ্টা করে যার পড়ানোর
কথা ছিল - তিনি শনি-রবিবার বাদ দিয়ে প্রায় রোজই আসতেন। ঘণ্টা চারেক করে থাকতেন।
অঙ্ক হোতো। গল্প হতো অঢেল। মাঝে মাঝে সদলবলে সঙ্গীতানুষ্ঠানে যাওয়া হতো। অঙ্কের মাস্টারমশাই,
তাঁর সহকর্মী আমার অন্যান্য শিক্ষকরা, আমি এবং বাবা! এবং এভাবেই বিলায়ত খাঁ, আমজাদ আলি, পারভিন সুলতানা, ভূপেন হাজারিকা আরো কত কে! মাস্টারমশাইয়েরও রবীন্দ্র সংগীত প্রিয় - তবে নজরুলগীতি আমি
মোটে জানি না - এটা ওনাকে ভীষণ দুঃখ দিল।
উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ
হয়ে গেল। কয়েকদিনের মধ্যেই I.I.T.
JEE এবং WBJEE ও হয়ে গেল। কিন্তু পরীক্ষার কথা কে বলতে পারে! তাই আমাদের অঙ্ক
করা বন্ধ হল না। I.S.I. এর পরীক্ষা আছে। তাই মাস্টারমশাই
আসতে থাকলেন। আর যেহেতু আমার রেকর্ড-প্লেয়ার নেই - তাই এনে উপস্থিত করলেন তার নিজের
ক্যাসেট প্লেয়ার আর গোটা পঞ্চাশেক ক্যাসেট। আমাদের দৌলতে আমার মায়ের ঘর সাজানোর শখ
শিকেয় তুলে দিতে হয়েছিল আগেই। বাইরের ঘরের divan পুরোপুরি ঢাকা ছিল অঙ্কের বইতে। পাঠ্যবইয়ের
বাইরেও যাবতীয় যত বইতে এগারো-বারো ক্লাসের অঙ্ক ছিল - সবগুলো মাস্টারমশাই আমার জন্য
এনে দিয়েছিলেন। তার সাথে নিজের B.Sc. ক্লাসের
physics
এবং chemistry বই। এখন তার সাথে যোগ হল ক্যাসেট।
সেই আমার
প্রথম ফিরোজা বেগমে ডুব দেওয়া। দুএকটা নয় - বেশ কয়েকখানা ক্যাসেট জুড়ে বুনে রাখা সুরের
জাল। আমার নির্জন দুপুর ভরে দিল - “দূর দ্বীপবাসিনী” র ছন্দ। আপ্লুত হয়ে শুনলাম - “তুমি
সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় - সে কি মোর অপরাধ!” আর সেই আবেদন - “আমায় নহে গো - ভালবাস মোর গান ..”
গ্রীষ্ম পেরিয়ে
বর্ষা এলো। রেজাল্ট বেরোল। বৃষ্টি ভেজা জুলাইতে সময় এলো বাড়ি ছাড়ার। যাবার আগের দিন
সারাদিন একঘেয়ে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। বর্ষা মাথায় করে মাস্টারমশাই এলেন দেখা করতে। জুলাই
মাসের ভেজা সন্ধ্যেতে ওনার প্লেয়ারে আমরা শেষবারের
মত শুনলাম - “এমনি বরষা ছিল সেদিন …।”
আমি পারিনি।
পরে একদিন বাবা মাস্টারমশাইয়ের বাড়ী গিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন গাঙ্গুলী-মুখার্জি, লোনি,
হল্-এণ্ড-নাইট, ক্যাসেট প্লেয়ার আর ক্যাসেটগুলো।
আমার কাছে
থেকে গেছে শুধু ফিরোজা বেগম।
No comments:
Post a Comment