এলোমেলো বয়ে যায় সময়
কিছু
একলা দুপুর
কিছু মন
খারাপ করা বিকেল
ভাঙনের
ভ্রুকুটিকে অগ্রাহ্য করে আজও
এক মুঠো
পলাশের খোঁজে পাগল হতে চায় ...
এলোমেলো
বয়ে যায় সময় -
ভাঙাচোরা
মন ছুটি চায়
সমুদ্র-পাহাড়-নদী
ছাপিয়ে বাসন্তী ঝড় ওঠে
অবাধ্য
মন আগুন মেঘের ছোঁয়ায় অকালবৃষ্টিতে ভেসে যেতে চায় ...
আপডেট করা মাত্রই চ্যাটবক্সে
ভেসে আসে অভিযোগ – “এত মনখারাপ করা
লেখা লিখিস কেন আজকাল? তোর লেখাগুলো লাইক করতে ইচ্ছেই করে না
আমার।”
“কে তোকে মাথার দিব্যি দিয়েছে যে আমি
লিখলেই তোকে লাইক করতে হবে!”
“তোর যা লম্বা স্তাবকের দল – এখুনি অ, আ,
ই, ঈ সবাই লাইক করতে শুরু করবে আর তুইও গলে যাবি। পরের ছুটিতে নাচতে নাচতে আলাস্কা,
টিম্বাকটু, দামাস্কাস চলে যাবি - আর আমি বরফের পাহাড়ে বসে তোর অপেক্ষায় আঙ্গুল
চুষতে থাকব!”
“তো! আমি যেখানেই যাই না কেন - তাতে তোর
কি অসুবিধা হল তা তো আমি বুঝতে পারছি না! তুই থাক না তোর ডাক্তারি, বাগান-বাড়ী,
লেক-পাহাড়-সমুদ্র - সব নিয়ে!”
“রাগ করলি?”
“না। রাগ করতে যাব কেন!”
“তাহলে ঝগড়া করছিস কেন?”
“আরে। ঝগড়া তো
তুই শুরু করলি! সম্পূর্ণ অকারণে! Anyway শোন – আমি এখন
রান্না করতে যাচ্ছি! Bye!”
ম কে আর কোন কথা বলার সু্যোগ না দিয়ে
ফেসবুক থেকে লগ-আউট করে গেল ঋ।
এই ঝগড়ার শুরু
হয়েছিল স্কুলের মাঠে। দেশ-কাল ডিঙিয়ে, ইতিহাস-ভূগোলের বাধা উপেক্ষা করে – সেই ঝগড়া আজও
চলছে।
..................................................................................................................................
রবিশঙ্কর মারা গেলেন।
এক ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় নেতাজী ইনডোর
ষ্টেডিয়ামে রবিশঙ্করের সেতার শুনতে গিয়েছিল ঋ আর স। সেই প্রথম একা একা কোলকাতায়
গেছিল ঋ। ঋ জানত না উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান থাকলে কোলকাতার শ্রোতারা নাকি সারা
রাত লাইন দিয়ে টিকিট কাটে। ঋ সেতার শিখত। তাই সারা রাত লাইন দিয়ে দুটো টিকিট যোগাড়
করেছিল স।
অনুষ্টানের আগের দিন ঋ এর জন্য আরেকটা
টিকিট নিয়ে হাজির হলেন শ। বলব বলব করেও ঋ কিছুতেই বলে উঠতে পারল না যে ও এবার স এর সাথে যাবে। ভেবেছিল পরে বলে
দিলেই হবে যে ও একা একা গিয়ে পৌঁছতে পারেনি। অত ভিড়ের মধ্যে শ য়ের পক্ষে সম্ভব ছিল
না ঋ কে খুঁজে বার করা।
কিন্তু আলাপে মন দিতে পারছিল না ঋ। শ কি
গেটেই দাঁড়িয়ে আছেন ওর জন্য? নাকি ভেতরে এসে বসেছেন! আলাপ শেষ। রবিশঙ্করের মীড়ের
কাজ বড় পছন্দ করেন শ।
ছুটির পর হোষ্টেলে পৌঁছে শ এর চিঠি পেয়েছিল ঋ –
“তোমাকে সেদিন বলব বলব করেও বলা হয়ে ওঠেনি। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আগামী তেসরা
মাঘ। বাবা-মাকে সাথে নিয়ে তুমিও এস।”
টুকরো টুকরো সময় জুড়ে জীবনের নক্সিকাঁথা -
আমজাদের সরোদ, রবিশঙ্করের সেতার,
বিসমিল্লার সানাই, বিলায়েতের ভৈরবী,...
রাতভর জলসায় - সুরের সমুদ্রে ডুবে যেতে যেতে
কখনো ভালোলাগা, কখনো প্রেম, কখনো আগুন!
হলুদ খামে এখনো বন্দী অষ্টাদশী মন -
জোছনা-হারানো কমলা চাঁদ হাতছানি দিয়ে ডাকে –
টুপ টুপ করে তারারা খসে পড়ে
ভাবি আর নয় - এবার মুক্তি দেব বন্দিনীকে।
মুছে যাক যত তীব্র সুখস্মৃতি -
ভেসে যাক যত যন্ত্রণাদীর্ণ সময় -
জেগে থাক শুধু নিরুত্তাপ দিনযাপন।
ফেসবুকে আজ ক এর
ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট। ক য়ের সাথে যেদিন শেষ দেখা হয়েছিল – সেদিন ছিল কোজাগরী
পূর্ণিমা। পূজোর ছুটির পর দল বেঁধে হোষ্টেলে ফিরছিল ওরা।
বাস ছাড়তে ছাড়তে বেলা
গড়িয়ে গেছিল সেদিন। অন্ধকারের বুক চিরে বাস ছুটছিল। রাস্তার দুপাশে জোছনামাখা গভীর
শালবন। আলোছায়ার বিচিত্র খেলা দেখতে দেখতে একসময় ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল ঋ এর। ময়ের কাঁধে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল ঋ। হঠাৎ
ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। চকিতে জানলার দিকে আরেকটু সরে গিয়েছিল ঋ।
শেষ পথটুকু
রিক্সায় একসাথে পেরিয়েছিল ঋ আর ক। ঋ নেমে যাবার ক বলল – “কেন যে তুই কাল আমার বাড়ি
গেলি!” এই অদ্ভূত অভিযোগে একটু থমকে গিয়ে ঋ বিড়বিড় করে বলল “ম জোর করে ধরে নিয়ে
গেল যে!” কিন্তু কথা শেষ করারও আগে ক হেঁটে চলে গিয়েছিল ওর ঠিকানায়। আর কোনদিন
দেখতে পায়নি ক’কে ক্যাম্পাসে। শুনেছিল ক নাকি কলেজ ছেড়ে দিয়েছে।
“কেমন আছ?”
ক কি ওকে “তুমি”
বলত নাকি! “ভালই। তুমি?”
ইনবক্সে অনেক
কিছু টাইপ করে যাচ্ছিল ক। ঋ এলোমেলো ঘুরে বেরাচ্ছিল ফেসবুকে। ক যা লিখল তা শেষ
পর্য্যন্ত পাঠালো না ঋ কে। শুধু লিখল “মনে হয় তুমি ব্যস্ত আছ! ফোন নাম্বার
পাঠাচ্ছি। ইচ্ছে করলে ফোন করো।”
ফোন করব করব করেও
করা আর হয়ে ওঠে না। কিই বা বলার আছে!
পরের দিন সকালে ক’য়ের পাতায় একটা পেনসিল স্কেচ! একটি মেয়ে সেতার বাজাচ্ছে। তার চুল মেঘ হয়ে উড়ে যাচ্ছে। আকাশের অন্য প্রান্তে আরেকটি মুখ। শুনছে - নাকি কিছু বলছে – বোঝা যাচ্ছে না ঠিক।
“অপূর্ব্ব!”
“তোমার পছন্দ হয়েছে? তোমার বাড়ীর ঠিকানাটা দাও। তোমাকে পাঠিয়ে দেব এটা!”
ছবি এসে পৌঁছয় পনের দিন পর। মোড়ক খুলে ঋ দেখে ওপরের কাঁচটা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। একটা একটা করে কাঁচের টুকরো ফেলতে থাকে ঋ – খুব সাবধানে – তাও আঙ্গুল কেটে এক ফোঁটা রক্ত লেগে যায় সেতারবাদিকার কপালে।
বুকের ভেতর
বৃষ্টি পড়ে – পড়েই চলে রাত্রিভোর
শিউলিবোঁটার
মেহেন্দীতে বন্ধক রাখা কিশোরি ভোর
হারিয়ে ফেলি -
আবার খুঁজি – খুঁজেই চলি জীবনভ’র!
অবুঝ মনের বয়স
বাড়ে না! বৃষ্টি পড়ে উপুর-ঝুপুর
বৃষ্টিভেজা
গন্ধরাজে - লুকিয়ে রাখা মেঘলা দুপুর –
স্মৃতির ভাঁজে
হলদে-ফিকে – দহনজ্বালা তীব্র মধুর!
দহন নাকি
আত্ম-হনন?
হলুদ ঘাসে শিশিরপাত
জোছনাভেজা চাঁদের
বুকে হারিয়ে যায় হেমন্ত রাত –
যাক হারিয়ে!
গোলাপকাঁটা ঠোঁট ছুঁয়েছে – শরীর জুড়ে
রক্তপাত -
ময়ের দুঃখ আবার উথলে ওঠে।
“শালা – ক যা করবে তুই তাইই লাইক করবি!”
“কেন! ছবিটা তো সুন্দর!”
“তোরা দুজনে তো দেখছি mutual admiration
club খুললি!”
“যদি খুলিও তোর
কেন গায়ে লাগছে তা তো বুঝতে পারছি না!”
“নাহ ঠিক করলাম
বিয়েটা এবার করেই ফেলব বুঝলি!”
“আমার বোঝাবুঝির কি আছে। আমার তো ছেলের বিয়ে দেবার সময় হলো এবার। তোরই তো বুঝতে বুঝতে সন্ধ্যে হয়ে গেল!”
“ধ টা ছাড়ছে না বুঝলি! বলে ঋ আর আসবে না! চল আমরা সংসার পাতি!”
“আমি আবার তোর পিকচারে আসি কি করে! সব ঘেঁটে দিস কেন তুই?”
“না আসিস না তা ঠিক! কিন্তু ধ মানতে চায় না যে!”
“ধ তো বিয়ে করতে চেয়েছে তোকে! দেখছিস তো! তুইই সারা জীবন শুধু confused থেকে গেলি!”
“যা বলেছিস। চল কাজ আছে অনেক। ভাবছি পরশুই তাহলে বিয়েটা করে ফেলি!”
“যা। Congratulations!”
“দেখ যদি পরের ছুটিতে আসতে পারিস আমাদের দেশে। ধ খুব খুশি হবে!”
“আর তুই?”
“আমি?”
ঝুপ করে লোডশেডিং। নেটওয়ার্ক কানেকশান কেটে গেল। ঘরের জানালাগুলো খুলে দিল ঋ। এপ্রিলের মাঝামাঝি। ধু ধু আকাশের বুকে কোথাও একফোঁটা মেঘ নেই। অমলতাসের ঢল নেমেছে। খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে ঢুকে পড়ছে হলুদ পাপড়িরা - আনাচে কানাচে উড়ে বেড়াচ্ছে – এলোমেলো করে দিচ্ছে ঋ এর সাজানো ঘর ।
ঋ ভিজে যাচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে সেই সোনালী সন্ত্রাসে।
নিঝুম দুপুর, সোনা রোদ্দুর, স্মৃতিভারে উন্মণ -
অমলতাসের বেহিসাবী ঢলে ফের বসন্তের আবাহন!
তুমি চলে গেছ কবে! তবু অবাধ্য মন জুড়ে -
উথালপাতাল অমলতাস - হলুদ বৃষ্টি ঝরে!
প্রৌঢ় বিকেলে চালসে চোখে -বসে থাকি একাকি -
ধরা পড়ে আজ হলুদের সাথে কত ফাঁকি ছিল মাখামাখি!
এত যন্ত্রণা, এত রাগ করি -তবু উদাসী অমলতাস
চৈত্র বেলায় আগুন ঝরায়, ঘটায় সর্বনাশ!
কালবৈশাখী তাণ্ডবে মাতে – হলুদ পাপড়ি ওড়ে
বাসন্তী ঝড়ের বেপরোয়া ত্রাসে ধ্বংসের তান ওঠে!
ঝড় থেমে যায়, ফুল ঝরে যায় - তবু থামে না যে পথচলা
নিবিড় থেকে নিবিড়তর এখন দহনবেলা!
