বাংলা মাসগুলো আসত জোড়ায়-জোড়ায় । আষাঢ়-শ্রাবণ, ভাদ্র -আশ্বিন,... ইংরাজি মাসগুলো
মূলতঃ individualistic হলেও - May-June
বা July – August কে ভাবতাম জোড়ে । প্রথম দুটি গ্রীষ্মকাল - দ্বিতীয় জুটি বর্ষাকাল। কিন্তু
ছোটবেলার অনেক শিক্ষার মতোই এটাও মনে হচ্ছে ভুলে যেতে হবে। গত এক সপ্তাহ দিল্লিতে বৃষ্টির
ছিটেফোঁটাও নেই। নির্মেঘ আকাশ - দায়সারা গোছের নীল। মাঝে মাঝে দু একটা হাল্কা ছাই ছাই
মেঘ এদিক ওদিক থেকে ভেসে আসছে - দেখে মনে হচ্ছে উদ্ভ্রান্ত পথিক - পালাতে পারলে বাঁচে।
হলই বা August
শেষ হতে এখনো খানিক
দেরী - তাতে ওদের বয়েই গেছে।
ওদিকে দূরভাষে মায়ের অভিযোগ
- কোলকাতায় রোজ বৃষ্টি। ডাক্তার-বাজার সংসারের সাত-সতেরো খুঁটিনাটি কাজ জমে যাচ্ছে
- করা যাচ্ছে না সময়মত। তার সাথে আবার ভাদ্রের গরম! ভাদ্র! চমকে গেলাম। ভাদ্র এসে গেছে
বুঝি! ও হ্যাঁ - তাই তো! এই ফ্যাকাশে নীল আকাশ দেখতে দেখতে, আর রাজধানীর গরম মেজাজে
ঝলসাতে ঝলসাতে দিন-ক্ষন সব গুলিয়ে যায়। তা হোক। ভাদ্র এসে গেছে মানে আশ্বিনও তো এলো
বলে তার পেছন পেছন! আর আশ্বিন মানেই পূজো!
ক্যালেন্ডার বলছে গান্ধীজীর
আশির্বাদে এবার পূজোয় ছুটিটা লম্বা করে নেওয়া যেতে পারে।
কিন্তু তারপর? পাহাড় কিম্বা
সমুদ্রে যাওয়া যেতে পারে।
কিন্তু সে তো সারা বছরই
যাওয়া যেতে পারে! আশ্বিনে কেন? রাস্তা চলতে চলতে তো সেখানে শিউলি ঝরে পড়বে না টুপটুপ
করে। শিউলি না ছুঁতে পারলে আমার আবার আশ্বিন বৃথা হয়ে যায়। ভোর বেলা মায়েরা যেত ফল কাটতে, কলাবউকে স্নান করাতে - আর আমরা শিউলির ঢের নিয়ে বসতাম বারান্দায়।
একছড়া, দুছড়া মালা গাঁথতে গাঁথতে হাহা হিহি। একশ-আটটা জবা আর স্থলপদ্মের মালাও গাঁথা
হতো। কিন্তু হাতে থেকে যেত শিউলির মেহেন্দি রেশ।
টুক করে টিকিট কেটে হুশ
করে কোথাওই তো চলে যাওয়া যায় - শুধু ফেরা যায় না ওই শিউলি, স্থল-পদ্ম, আম-জাম-কাঁঠাল
আর অজস্র পাতা-বাহার ঘেরা বাড়ীটাতে। আমাদের তিন বোনের ঘরের বাইরে ছিল একটা সাদা-গোলাপী গোলাপের ঝাড়। তাতে সারা বছর গোলাপ হতো।
আর ছিল একটা মাধবীলতা। যখন দুর্গাপূজো-কালীপূজো সব শেষ হয়ে যেত - খোলা জানালা দিয়ে
ঢুকে পড়ত হেমন্তের শিশির ভেজা মনখারাপের রাত - তখন তার সাথে মিশে থাকত মাধবীলতার সৌরভ।
সেই মনখারাপে ডুবতে ডুবতে, মাধবীলতার গন্ধে ভাসতে ভাসতে স্বপ্ন দেখতাম - একদিন ওই ছোট্ট
বাড়ীটা ছেড়ে, ছোট্ট শহরটা ছেড়ে - দুনিয়াটা দেখব। মাধবীলতা দুলতে দুলতে বলত - “হবে হবে
- সব হবে!” শুধু বেরোনোর স্বপ্নটাই দেখতাম। ফেরার স্বপ্নটা দেখতাম কিনা মনে পড়ছে না।
তখন কি আর জানতাম একদিন
সমস্ত মহাদেশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে আসতে পারলেও
- ফিরে যেতে পারব না ওই লাল মেঝের বাড়ীটাতে!
কেউ কি বলেছিল আমায় যে
এটাই অমোঘ সত্য যে ফেরাও যায় না - ফেরানোও যায় না। হয়তো বলেছিল - শুনিনি। কেউ শোনে
না। সবাই বেরোতে চায় ঘেরাটোপ ছেড়ে। তারপর আবার যখন বসন্ত-গ্রীষ্ম-বর্ষা পেরিয়ে শরৎ
আসে সবাই ফিরতে চায় ঘরে। কেউ কেউ ফিরতে চাইলেও ফিরতে পারি না।
কিন্তু তাই বলে তো আর মন খারাপ করে কাটিয়ে দেওয়া
যায় না অর্ধেক জীবন। তাই সেই সাদা-গোলাপী গোলাপ খুঁজে এনে আবার লাগাই এক অস্থায়ী আস্তানায়।
গোলাপের পাশে পাতা-বাহার। বাতাস তপ্ত তবু গোলাপের ঝাড় রোজ সকালেই বলে “ভাল থাকো”। আজ বাজার করে বাড়ী ফেরার পথে হঠাৎ দেখি ফ্ল্যাটবাড়ীর
বেড়ার ধারে বারোয়ারি মাধবীলতা ফুলের ভারে উপুড়-ঝুপুড়! ঝিরঝিরে হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে - আমাকে থামিয়ে
দিয়ে বলল - “হোক না আকাশ গোমড়া, না থাকুক তোমার লাল-মেঝের হলুদ বাড়ী, আমরা তো আছি।”
মনখারাপ একটু একটু করে মুছে যায় মাধবীলতার হাসিতে - তবু স্বপ্নের ভেতর ঘুরে ফিরে আসে
সেই বাড়ী। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ঘুরে বেড়াই সারা রাত্তির - আঠেরোতে ছাড়া সেই বাড়ী, পঁচিশে
শেষ হেঁটেছিলাম যার বুকে।
No comments:
Post a Comment