(১)
রাত দিন পার করে পাঞ্জাব মেল ছুটছে হাওড়া থেকে অমৃতসর। ভ্রমণপ্রিয় বাঙ্গালী। গরমের ছুটিতে হিমালয়, তো শীতের
ছুটিতে সমুদ্র। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর রিয়ার
এবার বিশেষ অবসর। স্কুল খুললে হাফ-ইয়ারলির চিন্তা নেই। রুমকির ক্লাস নাইন।
তাই মাঝে
মাঝেই ঘ্যানঘ্যান করছে - “তোমার আর কি রিয়াদি
- আমার তো ফিরেই পরীক্ষা!” তাতে যে আপাতত ওর কি অসুবিধা রিয়া সেটা ঠিক বুঝতে পারছে
না । তবে রিয়া ওর স্বভাবমতো মুখে কিছু না বলে
শুধু মিষ্টি হেসে ওকে অভয় দিচ্ছে। রুমকির মা - কণিকা মাসী একবার ধমক দিলেন - “চুপ করবি রুমকি! পড়ে তো একেবারে উল্টে দাও তুমি! একটু গান-টান কর না তোরা! রিয়া তুই ধর!”
রিয়া লাফ দিয়ে ওঠে - “ওরে বাবা। গান! আমি একেবারে গাইতে পারি না মাসী!”
চাঁপার কলির
মতো আঙ্গুল দিয়ে রিয়ার সে প্রতিবাদ নস্যাৎ করে দিলেন কণিকা মাসী - "যাঃ - বাজে বকিস না। তুই এত ভালো নাটক করিস!
ধর ধর।” কি মুশকিল - নাটক আর গান এক হল! কিন্তু কণিকা মাসীকে বোঝায় কে! অদ্ভুত সুন্দর
আর প্রাণবন্ত এই মহিলার ঝরঝরে হাসির তোড়ে দুনিয়ার যে কোন সমস্যাই খড়কুটোর মত ভেসে চলে
যায়! ভাগ্য ভালো - রিয়া সেই স্রোতে ভেসে যাবার আগেই অমিতকাকু গান ধরে ফেলেছে -
“কেন দূরে থাকো - শুধু আড়াল রাখো - কে তুমি, কে তুমি আমায় ডাকো!”
অমিতাভ মিত্র দুর্গাপুর Regional Engineering
College এর Mechanical Engineering department এর সর্বকনিষ্ঠ শিক্ষক। রুমকি ওকে চুপি চুপি জানিয়ে
দিল “জানো তো অমিতকাকু Rochester থেকে PhD করেছে।
আমার পিসতুতো দাদা - সেই শুভ্রদাদা - মনে আছে? ওর সিনিয়র।” রিয়ার বাবা, প্রফেসর অমিয়
বসু অঙ্ক বিভাগের প্রধান-অধ্যাপক। কনিকামাসীর বর, প্রফেসর রজত সেন ওরফে রজতকাকু Chemical
Engineering এর অধ্যাপক। শুভ্রকে রিয়ার ভালোই মনে আছে। ছুটিছাটাতে যখনই শুভ্র আসত দুর্গাপুরে, ওরা সবাই
মিলে কখনো রণ্ডীয়া, কখনো ভবানী পাঠকের টিলা, কখনো অজয়ের ধারে পিকিনিক করতে গেছে।
“Rochester
থেকে PhD করে এখানে এসেছে কোন দুঃখে?” - রিয়া ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে রুমকিকে। রুমকি ঠোঁট উলটে অজ্ঞতা প্রকাশ করে।
গান শুনতে শুনতে কাঁচের জানলার প্রতিফলনে রিয়া চেষ্টা করে সর্বানীমাসীর
মুখটা পড়তে। অমিতকাকু ভেসে যাচ্ছে কনিকামাসীর হাসিতে - কিন্তু তার সদ্য-বিবাহিত বৌ সর্বানীমাসীর মুখে কোন বিকার নেই - ভ্যানিটি
ব্যাগের ভেতর থেকে লিপস্টিক বার করে ঠোঁটে ঘষছেন। ফর্সা মুখটা হালকা পীচের ছোঁয়ায় আরো মনোলোভা হয়ে উঠল। অমিতকাকু চোখ বন্ধ করে গাইছেন - “কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো - কেন দূরে থাকো - শুধু আড়াল
রাখো -”
(২)
পরের দিন সকাল নটা নাগাদ ট্রেন পৌঁছল অমৃতসর। হোটেলে মালপত্র
রেখে, স্নান-টান করে সবাই চলল স্বর্ণমন্দিরে। আজ রাত্রেই আবার এখান থেকে ওরা যাবে জম্মু।
সেখান থেকে বাসে করে শ্রীনগর। ভাবলেই শিহরিত হচ্ছে রিয়া। বরফের ওপর হাঁটবে। দুহাতে
বরফ তুলে গালে ঘষবে। তবে আপাতত হোটেলের বাইরে পা দিতেই গরম হাওয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের
ওপর। রিয়া আজকাল মাঝে
মাঝে শাড়ী পরে। ওর ধারণা ওর ছোটখাটো ভারী গড়নটা শাড়ীতে তাও কিছুটা
মনোগ্রাহী হয়ে
উঠতে পারে। মা কিছু বলার আগেই রিয়া আজ শাড়ী পড়ে ফেলেছে। লাল-সাদা ছাপা-সিল্কের শাড়ীতে আজ রিয়ার মনে হল সত্যিই ও যেন হঠাৎ একটু বড় হয়ে গেছে।
উঠতে পারে। মা কিছু বলার আগেই রিয়া আজ শাড়ী পড়ে ফেলেছে। লাল-সাদা ছাপা-সিল্কের শাড়ীতে আজ রিয়ার মনে হল সত্যিই ও যেন হঠাৎ একটু বড় হয়ে গেছে।
মন্দিরের থেকে বেশ খানিকটা দূরে টাঙ্গাতেই জুতো খুলে রেখে পীচ-গলা রাস্তার ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে
হল মন্দিরে। মন্দির প্রাঙ্গণে ঠাণ্ডা জলে পা
ডুবিয়ে কি শান্তি! মন্দির ঘুরে, প্রসাদ খেয়ে বেরোবার মুখে হঠাৎ রিয়ার মা মাথা ঘুরে
পড়ে গেলেন। হীট-স্ট্রোক। মন্দিরের সেবকরা ছুটে এসে তাড়াতাড়ি মায়ের মাথায় জলটল
দিয়ে তাঁকে সুস্থ করে বসালেন। প্ল্যান ছিল এরপর জালিয়ানবাগ দেখে কিছু শপিং-টপিং করবে
ওরা। রিয়ার বাবা ঠিক করলেন ওর মাকে নিয়ে হোটেলে ফিরে যাবেন। রিয়া আর তুয়া বাকি সবার সাথে
ঘুরতে যাবে। রিয়া একটু ইতস্তত করছিল । কনিকামাসী বললেন “চল চল - তুই হোটেলে বসে কি
করবি! মা রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
মন্দির থেকে ফেরত এসে টাঙ্গায় উঠতে গিয়ে রিয়ার পায়ে শাড়ী জড়িয়ে
এক বিপত্তি। অন্য টাঙ্গা থেকে তা দেখে ছুটে এলেন অমিতকাকু। রুমকির ভাই পিকু আর তুয়াকে উনি পাঠিয়ে দিলেন সর্বানীমাসীর সাথে। নিজে
টাঙ্গায় উঠে বসে chivalrous কায়দায় হাত
বাড়িয়ে দিলেন রিয়ার দিকে - “উঠে আয়।” এক হাতে শাড়ী সামলে, রিয়া এক হাত সঁপে দিল সেই
হাতে। অমিতকাকুর হাতে ভর দিয়ে আর কোন বিপত্তি ছাড়াই অতঃপর রিয়া উঠে বসল অমিতের পাশে। পেছন দিকে বসে
রুমকি রিয়ার বিপত্তি দেখে হাসছে। রিয়া আস্তে করে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে নিতে লক্ষ্য করল
অমিতের ডান হাতের অনামিকা আর মধ্যমা সংযুক্ত।
(৩)
সকালবেলা
ট্রেন থেকে নেমে ওরা যখন এসে পৌঁছল জম্মুর বাস স্ট্যান্ডে - তখনো শহরটা
পুরোপুরি ঘুম
থেকে ওঠেনি। পেট্রলের গন্ধ, রোদ্দুর, ধোঁয়া, ধুলো ইত্যাদিতে
অনেকের অনেক সমস্যা। তাই ঠিক হয়েছে Air-conditioned বাসে যাওয়া হবে। এদিকে যত বাস ছাড়ছে কোনটাই বাতানুকূল নয়। অবশেষে
ওদের বাস ছাড়ল সকাল এগারোটায়।
সবে মে মাসের মাঝামাঝি। পাহাড় তখন সদ্য জেগে উঠেছে দীর্ঘ শীতঘুম
থেকে । পথের দুধার চিকন সবুজ। সে সবুজ কখনো দীর্ঘ গাছের মাথায় গাঢ় প্রায়ান্ধকার, কখনো উজ্জ্বল প্রাণোচ্ছল, কখনো কচি পাতায় ভীরু, নরম। নীল আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘ।
এদিকে বাসের রাস্তাতেও
নরম পশমে ঢাকা শয়ে শয়ে সাদা ভেড়ার দল। হেলতে দুলতে বেড়িয়ে পড়েছে ঘাস খেতে। নিজেদের
গ্রাম ছেড়ে তারা কোথায় চলেছে কে জানে! অথবা হয়ত আশা করছে শীতের শেষে বরফের তলা থেকে ফের বেড়িয়ে
পড়েছে নিজেদের বাসা - যাচ্ছে তারই খোঁজে। বাস
দুপা এগোয়, দশ মিনিট দাঁড়ায়। সে রাতে আর শ্রীনগর পৌঁছনো
গেল না। রাত এগারোটা নাগাদ বাস এসে দাঁড়ালো বাণিহাল পাসের কাছে একটা রেষ্ট-হাউসে। ছোট্ট
রেস্ট হাউসে অত লোকের ঠাঁই হয় নাকি! ভাগ্য ভালো তাও - রিয়ারা দুটো ঘর পেল। একটাতে ছেলেরা,
একটাতে মেয়েরা। হোল্ডল ছিল সাথে। তাই পেতেই শুয়ে পড়ল রুমকি আর রিয়া। মায়েরা তিনজন ঠাসাঠাসি
করে খাটে। তুয়া সোফায়। মাত্র তো কয়েক ঘণ্টা। ভোর ছটাতেই আবার বাস ছাড়বে।
শ্রীনগর শহরটাতে তখন বসন্ত। ফুলে ফুলে ভরে আছে বাগান।
হাউসবোটে ফুলের পসরা সাজিয়ে ডাল লেকে বিকিকিনি করছে ফুলের মতই সুন্দর কাশ্মীরি মেয়েরা।
ওদের হোটেলের পেছনের বাগান থেকে একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে ডাল লেকে। রাস্তার দুপাশে উইলো গাছ সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। দুপুরবেলা ঘর থেকে বেড়িয়ে
রিয়া চুপ করে বসেছিল জলের ধারে। চিনারের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে আঁকিবুঁকি কাটছে ওর
কোলে। এক একটা নৌকা যাচ্ছে আর জলের ভেতরে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে গাছের ছায়া, রিয়ার
মুখ। আবার একটু একটু করে তৈরি হচ্ছে পূর্ণ অবয়ব। মাঝে মাঝে রিয়া নিজেই আলতো ছুঁয়ে ঢেউ তুলছে জলে।
একটু একটু
করে রোদের উজ্জ্বলতা কমে যাচ্ছে। সূর্য্য যখন আগুন ধরিয়েছে জলের বুকে, তখন হইহই করতে
করতে এলো সকলে। বোটে চড়ে লেকে ঘোরা হবে। দুটো নৌকায় ভাগ হয়ে গেল ওরা।সর্বানীমাসীর
সানগ্লাসে আগুনের প্রতিচ্ছবি। অবাধ্য চুল একটা স্কার্ফ দিয়ে হাল্কা করে বাঁধা। টাইট
চুড়িদার আর ছোট পিঙ্ক কুর্তায় পুরো কাশ্মীর কি কলি।
একদিকে পাহাড়,
অন্যদিকে শহর। পাহাড়ের গায়ে গায়ে বাগান। ওরা নামল দুএকটাতে। কত রকমের যে গোলাপ! ধীরে
ধীরে হালকা সরের মতো নীল-ছাই-ছাই অন্ধকার ঢেকে দিতে এলো চরাচর। টুপটুপ করে তারারা জ্বলে
উঠছে একটা-দুটো । ওদের নৌকা ফেরার পথ ধরল। যখন ওদের নৌকাটা অন্যটার খুব পাশ দিয়ে যাচ্ছে
- অন্ধকার সাঁতরে ভেসে এলো গানের কলি
-
“মনে হয় যেন বারে বারে - এই বুঝি এলে মোর দ্বারে - সে মধুর স্বপ্ন
ভেঙো নাক - কেন দূরে থাকো - শুধু আড়াল রাখো …”
রাত্রে ডাইনিং
রুমে খেতে এসে ওরা দেখে দুর্গাপুরের শুভম-রূপমরাও এবার শ্রীনগরে। ওরা অবশ্য এসেছে শিমলা-মানালী
ঘুরে। রিয়ারা এরপর যাবে ওদিকে। রূপম আর রিয়া সমবয়সী। তাই ওদের দেখেই রূপম সোজা একটা
চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল তুয়া-পিকু-রুমকি আর রিয়ার টেবিলে। শুভম গত বছর যাদবপুরে ঢুকেছে
ইলেক্ট্রনিক্স পড়তে। তাই ও একটু ঘ্যাম নিয়ে দাঁড়িয়েছিল দূরে - এখন একা হয়ে গিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা
খেয়ে ভাবছে কি করবে। ওদের সাথে অমিতকাকুদের পরিচয় ছিল না। রিয়ার বাবা আলাপ করিয়ে দিলেন।
অমিতকাকু শুভমকে ডাকলেন। শুভম হাঁপ ছেড়ে ওদের টেবিলে গিয়ে একটা চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল। অমিতকাকু বললেন
- “আরে ব্রাদার স্পীড চাই বুঝলে তো স্পীড। ভাইটির থেকে ট্রেনিং নিয়ে নাও।” সর্বানীমাসী
হেসে কুটিপাটি - “তুমি না! সব সময় ফাজলামি! খা তো তুই!” শুভম লজ্জায় বেগুনি হতে হতে খাবারে মন দিল।
সুদূর কাশ্মীরে
বসে রিয়াদের পাতে একের পর এক আসতে থাকল গরম ভাত, ঘী, ভাজা মুগের ডাল, ঝুরি আলু ভাজা,
মুড়ি ঘণ্ট, রুই মাছের কালিয়া, চাটনি, পাঁপড়। বহু বছর আগে কাঁথি থেকে ভাগ্যের সন্ধানে
এখানে এসে হোটেল খুলেছিলেন দাসবাবু। জন্মভূমির স্মরণে হোটেলের নাম রেখেছেন Hotel
Cathay. ভ্রমণ-ক্লান্ত বাঙ্গালীরা এখানে থাকতে ভালোবাসে। রাত্রে মাছ-ভাত খেয়ে পরের
দিনের রসদ যোগাড় করে নেয়। যে ছেলেটা ওদের টেবিলে খাবার দিচ্ছিল - সদ্য সদ্য
এসেছে মেদিনীপুর থেকে। কথায় এখনো টান আছে। চাটনি দিয়ে ও যখন মিষ্টি দিতে এসেছে ওর বোধহয়
মনে পড়ল ওদের টেবিলে লেবু লঙ্কা দিতে ভুলে গেছে। ঠিক তখনি রূপম ওকে নাম জিজ্ঞেস করেছে।
ছেলেটা বিনীত ভাবে জানালো - “লবিন বটে। আপনাদের নেবু-নঙ্কা কিচু নাগবে?” ব্যাস আর যায় কোথায়! পিকু হঠাৎ ওর ট্রে থেকে
ঝপ করে একটা মিষ্টির বাটি তুলে রিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে ওকে নকল করে বলে উঠল - “ইয়া দিদি তুমার নেদিকেনি! নুচি-নেবু-নঙ্কা কিচু
নাগবে বটে?” ওর বলার ধরণে হোহো করে হেসে ওঠে রিয়া । ওর হাসির ধাক্কায় লবিনের হাত থেকে
একটা বাটি ছিটকে সোজা পাশের টেবিলে সর্বানীমাসীর কোলে। দরাম করে চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন
উনি। রিয়ার দিকে একঝলক দৃষ্টপাত করেই পিকুর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললেন
- “পিকু আমায় কাল বলিস কিন্তু জোকটা! Good
night guys. কাল দেখা হবে।”
সর্বানীমাসী
মিষ্টি না খেয়েই ঘরে চলে গেলেন। স্কার্ফটা পড়ে রইল চেয়ারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কনিকামাসী লবিনকে ডেকে বললেন “আমাকে দাও দিকি আরেকখানা নেদিকেনি!” ওনার বলার ধরণে এবার সবাই
হাসিতে ফেটে পড়ল। রূপম আস্তে করে রিয়ার হাতের ওপর ওর হাতটা রেখেই সরিয়ে নিলো। অমিতকাকু
ঘোষণা করলেন - “বাচ্চা পার্টি চলো আমরা একটু বাগানে হাঁটি। Follow me like the
Pied Piper of Hamlin. কনিকাদি আপনারা ঘরে চলে
যান।”
ঘরের আলোটা দপ করে নিভে গেল।
আকাশের বুকে
তখন কমলা রঙের চাঁদ। জ্যোৎস্নায় ভিজে যাচ্ছে গগনচুম্বী পাহাড়। ডাল লেকের বুকে ছোট্ট
ছোট্ট ঢেউয়ের দোলায় খান খান হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে চাঁদের প্রতিচ্ছায়া। গভীর সুখে তিরতির করে কাঁপছে চিনার। রিয়ার মনের ভেতরে গুনগুন
করা নিরুচ্চার সুরে কথা বসিয়ে অমিত খুব ধীর লয়ে গান ধরল - “চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে ...”
ধীরে ধীরে
সেই সুর মিশে গেল চাঁদের আলোয়, মিশে গেল ডাল লেকের জলে। পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে চতুর্দিকে
ছড়িয়ে পড়ছে সুরের অমৃতধারা - সেই সুরে ডুবতে ডুবতে ভিজতে ভিজতে ওরা বসে রইল হ্রদের
পাড়ে - কয়েকটি কিশোর-কিশোরী - যৌবনের প্রতীক্ষায়।
(৪)
হোটেল থেকে
রোজ সকাল সাতটায় বাস ছাড়বে। একদিন সোনমার্গ, একদিন পহলগাঁও আর একদিন গুলমার্গ। সাতটার
মধ্যে সবাইকে স্নান-টান করে রেডী হতে হবে। হোটেল থেকেই লাঞ্চ প্যাক করে দেবে - হয় পাঁউরুটি-ডিমের
ডালনা নয় পুরী-রাজমা। একটু কষ্টকর হলেও উপায় নেই - ওটাই নাকি নিয়ম। অমিতকাকু আর সর্বানীমাসী এলেন সবচেয়ে দেরীতে। বাসে উঠেই সোজা ড্রাইভারের পাশে চলে গেলেন অমিতকাকু। এত সকালে স্নান করার জন্য নাকি উনি প্রায় জমে
গেছেন - তাই ইঞ্জিনের পাশে বসবেন! রিয়া আর রুমকি একসাথে বসেছে । ওদের ঠিক পেছনে আড়াআড়ি
সীটে তিনজন যুবক। সোনায় সোহাগা। রুমকি তো একটাকে পছন্দই করে ফেলল।
ওর মতে - “দারুণ
হ্যান্ডসাম। একদম গ্রেগরি পেক।”
দেখতে খারাপ নয় ঠিকই ছেলেগুলো - হিমাচলী বোধহয় - কিন্তু
তা বলে গ্রেগরি পেক! রিয়া আর্তনাদ করে ওঠে -
“নাক থ্যাবড়া গ্রেগরি পেক! তুই বলতে পারলি রুমকি! বড়জোর রাজেশ খান্না বলতে পারিস!”
অগত্যা তাই মেনে নেয় রুমকি। কিন্তু একটু পরেই ওর ঘ্যানঘ্যান আবার শুরু হয় - “রিয়াদি
- ও তোমাকেই দেখছে। আমার দিকে তাকাচ্ছে না।”
রিয়া দিদি-সুলভ জ্ঞান দেবার চেষ্টা করল
- “একটু ইগ্নোর কর। ওরকম হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকিস না।”
রুমকিটা আসলে একটু সহজ
সরল প্রকৃতির। একটু পরে নিজের দুঃখ ভুলে গিয়ে ওর গ্রেগরি পেক ওরফে রাজেশ খান্না রিয়াকে
ঠিক কি কি ভাবে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছে তাতেই মশগুল হয়ে গেল।
ওরা ঘুরছিল পাইনের বনে। রিয়া একগাদা পাইনকোণ জড়ো করেছে। বাড়ী
ফিরে রং টং করে ড্রাই-ফ্লাওয়ারের ইকাবেনা করবে।
হঠাৎ সর্বানীমাসী বললেন ওনার শরীরটা খারাপ লাগছে।
রুমকি রিয়ার কানে ফিসফিস করে বলল -
“জানো তো সর্বানীমাসী প্রেগন্যান্ট। মা বলছিল ওদের আসাই উচিত হয়নি। কিন্তু অমিতকাকু
শোনেননি।”
সেদিন ওরা একটু তাড়াতাড়িই ফিরে এলো হোটেলে। বাকি যাত্রীরা সবাই কাছাকাছিই
ছিল - কেউ আপত্তি করল না।
বাস থেকে নেমে হোটেলে ঢোকার মুখে ওরা লক্ষ্য করল ওই তিনজন যুবক ওদের হোটেলেই উঠেছে। ঘরে না গিয়ে রিয়া আর তুয়া গেল বাগানে আপেল দেখতে। হাল্কা সাদ-গোলাপী
ফুলের ভারে আপেল গাছের ডাল নুয়ে পড়ছে। কোন
কোন গাছে একদম কচি ফল। ওরা খেয়াল করেনি কখন অমিতকাকু এসে দাঁড়িয়েছে বাগানে। ছবি তুলছে।
তবে মানুষেরও না - বাগানেরও না - সুর্যাস্তের। ছবি তোলার শেষে ক্যামেরা বন্ধ করে ঘরে
যেতে যেতে রিয়ার দিকে ফিরে একগাল এসে বললেন - “ওরা তো দেখছি তোর পেছন পেছন হোটেলে অবধি
চলে এসেছে।” রিয়া কোন প্রশ্ন কিম্বা প্রতিবাদ করার আগেই লম্বা লম্বা পা ফেলে জোরে গান
গাইতে গাইতে উনি ঘরে পৌঁছে গেছেন।
রিয়া তুয়াকে বলল - “চল ঘরে যাই - সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে।”
তুয়া
জিজ্ঞেস করল - “দিদি - ওরা তোর পেছন পেছন কেন
এসেছে? সামথিং রং?”
রিয়া বলল - “অমিতকাকুর কথা ছাড় তো! মাকে আবার বলতে যাস না কিছু!” পাইনের কোণ গুলো কোন ফাঁকে ওর হাত থেকে
পড়ে গেছে খেয়াল করেনি রিয়া।
পরের দিন পহলগাঁও। তবে আজ অমিতকাকুকে সকালে স্নান করা থেকে বোধহয়
রেহাই দিয়েছেন সর্বানীমাসী। গলায় একটা দুর্দান্ত মাফলার ঝুলিয়ে অমিতকাকু আজ সর্বানীমাসীর
পাশেই। বাসে আজও সেই তিন যুবক। রুমকির হাহুতাশ।
রিয়ার একটু বিরক্ত লাগছিল।
লিডার নদীর বুকে বড় বড় পাথর। মাঝে মাঝে বাধা পেয়ে তাই নদী আরো
দুর্দান্ত হয়ে উঠেছে। রিয়া চুপচাপ একটা পাথরের ওপরে বসেছিল। বাকিরা নদীর পাশে
মাঠে বসে আড্ডা মারছে। নদীর জল পাথরের গায়ে লেগে ছিটকে ছিটকে এসে রিয়ার চুলে, মুখে,
চোখের পাতায় হীরের কুঁচির মতো আটকে যাচ্ছে।
হঠাৎ রুমিকির গ্রেগরি পেক এসে রিয়াকে বলে - “If you
don’t mind can I please take a photograph of you – just as you are sitting. You
look amazingly beautiful in this red dress.” রিয়া হকচকিয়ে কিছু বলার আগেই ওর মা ছুটে এসেছে - পেছনে পেছনে কণিকা মাসী। মা রিয়াকে এবং সেই ছেলেকে - দুজনকেই এই মারে তো সেই মারে! কণিকামাসী খুব মিষ্টি করে হেসে ওকে বললেন - “Sorry
dear. You know you can’t do this.”
ছেলেটি
অবশ্য কোন রাগ টাগ না করে দিব্যি সুন্দর করে হেসে বলল - “Sure
Ma’am. No problems. She is so beautiful।
I wanted to click her just like that – lost in her own thoughts. I am a professional
photographer. But no problems. See you.”
মায়ের রাগ আর পড়তেই চায় না। “তুই কি বলে রাজি হলি!
জানিস না এই সব ছবি নিয়ে ওরা কি করে!”
কি করে বা কি করতে পারে - এত কথা রিয়া সত্যিই
জানে না। প্রথম কথা পুর ঘটনাটাই এত দ্রুত ঘটে গেল যে ও রাজি বা গররাজি কোনটা হবারই
অবকাশ পায়নি। কিন্তু মা রেগে গেলে মাকে কিছু বোঝানো খুব মুশকিল। বিশেষ করে মায়ের যখন
ধারণা যে পৃথিবীর সব খারাপ ছেলেরাই তার মেয়ের জন্য ওঁত পেতে বসে আছে।
“সব মায়েরাই এরকম
বলে। তবে তোমার মা ভুল বলেননি!” - অমিতকাকুর ফোড়নে এই প্রথম রিয়া তেলেবেগুনে জ্বলে
উঠল। সর্বানীমাসী মুচকি হেসে ব্যাগ থেকে ফেস-পাঊডার, লিপস্টিক খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
ভাগ্যিস এখানে বাবা নেই। তাহলে বোধহয় কালকেই টিকিট কেটে ওদের ট্রেনে উঠে পড়তে হত। এতক্ষণে রিয়ার খেয়াল হয়েছে - সত্যি তো!
বাকিরা কোথায়? কনিকামাসী জানালেন - কেউ কেউ
রাজমার প্রকোপে গভীর দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে আড়াল খুঁজতে গেছে এদিক-ওদিক! বাকিরা গেছে
পাহাড়া দিতে।
পরের দিন
গুল্মার্গ। বাস থেকে নেমে জানা গেল যে ঘোড়ায় চড়ে নাকি যেতে হবে পাহাড় চূড়ায়। ঘোড়াতে
রিয়ার প্রবল আপত্তি। কি দুর্গন্ধ! মা আর সর্বানীমাসী এমনিতেও যাবে না। রুমকি খুব চেষ্টা
করছে রিয়াকে রাজি করাতে। হঠাৎ দেখে অন্য বাস থেকে নেমেছে রূপমরা। ওরাও ঘোড়ার দরদাম শুরু করল। রিয়া যাবে না
শুনে শুভম হঠাৎ সকলকে চমকে দিয়ে সটান রিয়ার হাত ধরে টেনে বলল - “চলো চলো - না হলে একটা দারুণ সুযোগ মিস করবে।
মা আমি ওকে আমার সাথে নিচ্ছি। তুমি একদম চিন্তা করো না মাসী।” রিয়া আড়চোখে একবার মায়ের
দিকে দেখল। যাদবপুরে ইলেক্ট্রনিক্স পড়া ছেলেদের নিয়ে মায়ের সেরকম কোন চিন্তা আছে বলে
মনে হল না।
ঘোড়ার পিঠে
দূরত্ব বজায় রেখে বসা সম্ভব নয়। যদিও রিয়ার জীবনে এই প্রথম এক উনিশ বছরের যুবক পৃথ্বীরাজ
হয়ে এলো -কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে কোন চাঞ্চল্য বোধ হচ্ছে না রিয়ার। ভাবল রূপমের
দাদা বলে বোধহয় এমন হচ্ছে। একটু অস্বস্তিকর রকম রোমাঞ্চ-বিহীন হল পাহাড়ে চড়াটা। রিয়াকে আরো খানিকটা ইমপ্রেস করতে এবার পকেট থেকে সানগ্লাস
বের করল শুভম। আর পারলো না রিয়া। “যাই দেখি - রূপম আর রুমকি কি করছে!” বলে কেটে পড়ল
ওখান থেকে।
রুমকিদের
খুঁজতে গিয়ে রিয়া আবিষ্কার করল অমিতকে। একটু দূরে একা একটা পাহাড়ের ওপর একা বসে আছে অমিত।
আকাশের দিকে মুখ। রিয়ার দিকে পেছন ফেরা। রিয়া আস্তে আস্তে গিয়ে অমিতের পেছনে দাঁড়ালো।
অমিত মুখ না ফিরিয়েই বলল - “বোস! দাঁড়িয়ে রইলি কেন!” রিয়া বসে পড়ল ঘাসের ওপর।
“একটা গান
কর।”
“আমি গান
করতে পারি না!” - এই প্রথম গান না করতে পারার জন্য ভীষণ কষ্ট হল রিয়ার।
“আমি গাই?”
রিয়া হেসে
ফেলল। যেন ওর অনুমতি ছাড়া উনি গান না!
“এত দিন যে বসেছিলেম পথ চেয়ে আর কাল গুনে - দেখা
পেলেম ফাল্গুনে…”
রোমাঞ্চ ছিল
না পুরুষ শরীরের ঘনিষ্ঠতায় - কিন্তু এখন একহাত দূরে বসেও রিয়ার সমস্ত শরীর জুড়ে প্রথম
বসন্তের ঝিরঝিরে হাওয়া - যাতে তীব্র সুখের সাথে মিশে আছে উদাসী বিষণ্ণতা। জোড়া আঙ্গুলের
ফাঁকে পুড়তে থাকা সিগারেটের ধোঁয়ায় প্রথম পাপের বাসনা মিশে যাচ্ছে - ছড়িয়ে যাচ্ছে পাইনের
বনে, উড়ে যাচ্ছে বরফ-ঢাকা পাহাড়-চূড়ার দিকে।
(৫)
পাঠানকোট
থেকে সাধারণ বাসেই যেতে হবে মানালি। রিজার্ভেশনের কোন ব্যাপার নেই। সে যে এক অভিজ্ঞতা হবে তা অপেক্ষারত বাস যাত্রীদের
দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। পোঁটলাপুটলিতে জামাকাপড়, খাবারদাবার তো আছেই - তার সাথে আছে টেবল-ফ্যান, মুরগী এবং ছাগলছানা।
বাস এসে দাঁড়াতেই বাবা আর রজতকাকু গেলেন বাসের ছাদে মাল তোলার তদারকি করতে। অমিতকাকু
স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দলের গাইডের ভূমিকায় সবাইকে সীটে বসাবার দায়িত্ব নিলেন। সীট পাওয়া যাচ্ছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। মায়েদের তিনজনকে একটা সীটে বসিয়ে দিলেন - আর একটা সীটে তুয়া,
পিকু আর রুমকি। রুমকি প্রতিবাদ করতে গিয়ে ধমক খেল। প্রায় অলৌকিক ক্ষমতায় এরপর যোগাড় করে ফেললেন আরো দুটো সীট - বাবা আর রজতকাকুর জন্য। রিয়া ধৈর্য্য ধরে দাঁড়িয়ে আছে - ক্যাপ্টেন কখন ডাকে! শুধু ওদের দলকে না - রিয়া দেখল অমিতকাকু অনেককেই “ভাইসাব আপ উধার বইঠ যাইয়ে, বহেনজী আপ ইধার আইয়ে” - বলতে বলতে পেছনের দিকে যাচ্ছেন। মোটামুটি উনি আজ
সবারই লীডার। পেছনের দরজাটা বন্ধ। টেবিল ফ্যানের মালিক পেছনের সীটে বসে সিঁড়ির সামনেই
ফ্যানটা রেখেছেন। ফ্যানের তলায় এক জোড়া মুরগী। অমিতকাকু লম্বা লম্বা পা ফেলে ফ্যান ডিঙ্গিয়ে পেছনের লম্বা সীটের মাঝামাঝি বসে রিয়াকে ডাকলেন - “এদিকে চলে আয়।” জানালার
পাশে এক ভদ্রলোক বসে আছেন। রিয়া গিয়ে বসল তার পাশে। ওর বাঁদিকে অমিত। বাস চলতে শুরু
করল।
অমিত টেবিল
ফ্যানের মালিককে জিজ্ঞেস করে জানল যে সে যাবে মাণ্ডি। ওখানেই তার বাড়ি। “মাণ্ডীতে টেবিল ফ্যান দিয়ে কি করবে ভাই?” বিগলিত
হেসে ছেলেটি জানালো - “শাদী হ্যায় মেরা। ইয়ে দহেজ মে দেনা হ্যায়।”
“আরে বাধাই
হো! আপ সো যাও ভাইয়া। হম সমহালকে রাখেঙ্গে ফ্যান। ইসকে বাদ তো আপকো সোনে কা মওকা নহি
মিলেগা!” লোকটা লজ্জায় লাল হয়ে জানলার বাইরে মন দিল।
অমিতকাকুর
বলার ধরনে হেসে ফেলেছে রিয়ার ডানপাশের সহযাত্রীও। ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন - “Hi!
I Am Ashish! Going to Manali?”
“Yeah. I
am Riya.”
অমিতকাকু নিজের পরিচয় দিলেন।
“First time to Manali?”
“Yes. Are you a resident of Manali?” - রিয়া জিজ্ঞেস করল।
“Most of the times – yes though I am
from Chandigarh. I am an instructor at
the Mountaineering Institute. Do you love mountains?”
রিয়া জানালো যে ওর এই প্রথম ওর পাহাড়ে বেড়াতে আসা। পুরুলিয়া
কিংবা বাঁকুড়ার পাহাড়ে পিকনিক করতে যাওয়া ও হিসেবে ধরছে না।
“During summer vacations Bengalis take over the
Himalayas. But Manali is still a young hill-station. You will love it.”
আশিস রিয়ার সাথে গল্প জুড়ে দিল - পাহাড়ের গল্প, চণ্ডীগড়ের গল্প। রিয়াকে জিজ্ঞেস করল দুর্গাপুরের কথা। রিয়ার খুব
ভালো লাগছিল - এক নির্ভার ভালো লাগা - বেশ একটা বড়ো হয়ে যাওয়ার অনুভূতি! অমিতও যোগ
দিচ্ছে মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে ওর স্বভাবমতো গান গাইছে, অন্যান্য যাত্রীদের হাঁড়ির খবর
নিচ্ছে। ওর কথা বলার ধরনে রিয়ার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার যোগাড়।
দুপুর নাগাদ বাস এসে পৌঁছল মাণ্ডী। ফ্যানের মালিক নেমে গেলেন
বিয়ে করতে। রিয়ারাও লাঞ্চ করে নিলো। এই অঞ্চলের ধাবার আলু পরাঠা, গোবী পরাঠা আর আণ্ডা
ভুজ্জি জগদ্বিখ্যাত। সাথে ঘরে তৈরি আচার।
এবার বাসে উঠে আশিস রিয়াকে জানলার ধারে বসতে বলল - “You will
simply love the mesmerizing beauty of the Kullu valley.”
অমিতকে বলেছিল রিয়ার পাশে বসতে। অমিত হেসে প্রত্যাখ্যান করল। রিয়ার দিকে চোখ টিপে বলল - "পাগল!"
বাস চলছে পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকে বেঁকে। জানলার বাইরে কখনো খাড়া
পাহাড়, কখনো গভীর খাদ। দুপুরের মিঠে রোদ্দুর লুকোচুরি খেলছে রিয়ার সাথে। আশিসের নরম
বাদামী চোখেও ও দেখছে
মেঘ-রোদ্দুরের খেলা। পাহাড়ী রাস্তায় সোজা বসে থাকা মুশকিল। বাস
বাঁক নিলেই কখনো
আশিস রিয়ার দিকে, কখনো রিয়া আশিসের দিকে পড়ে যাচ্ছে। নীল ফেডেড জিনস আর ছোট্ট ছাই-ছাই ঘাস ফুল ছাপা সাদা
সুতির শার্ট - আশিস নিঃসন্দেহে সুদর্শন - রিয়ার শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ছে এক অদ্ভুত
ঝিম-ধরানো মাদকতা।
সূর্য্য যখন একদিকে ঢলে পড়ল আশিস রিয়াকে বলল - “এখন জানলা থেকে
চোখ সরিও না।” বাস কুলু উপত্যকা পেরচ্ছে। বাইরে তখন সোনালী বিকেল। চতুর্দিকে গাঢ় সবুজ
পাহাড় ঘিরে রয়েছে ওদের। পৃথিবীর বুকে অকাতরে গলন্ত সোনা ঢেলে দিচ্ছে আকাশ। নীচে পাহাড়ের
কোলে কুল্লু উপত্যকায় পাকা গমের ক্ষেতে যেন আগুন লেগেছে। বিদায় নেবার আগে আকাশের বুকে
হোলিখেলায় মাতল অস্তগামী সুর্য্যের রশ্মি - সোনা রং মুছে লাল-গোলাপী-কমলা-বেগুনী-নীল
- রঙের ফোয়ারা খুলে গেছে - ক্ষণে ক্ষণে বদলে বদলে যাচ্ছে আকাশের ছবি - রঙের সমুদ্রে ডুব দিচ্ছে রিয়া। মুগ্ধ বিস্ময়ে স্তব্ধ
হয়ে আছে ও। আশিস বলল - “Now you know why I love this place.”
ধীরে ধীরে পাতলা সরের মতো হাল্কা নীল অন্ধকার রং শুষে নিতে নিতে
ছেয়ে ফেলল চরাচর। অজানা বিষাদ আর অনাস্বাদিত
গভীর সুখের মাঝামাঝি একটা ক্ষীণ রেখায় দাঁড়িয়ে রিয়ার খুব গান শুনতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু
অমিতকাকু একটু দূরে - আশিসের ওপাশে।
(৬)
রাতের অন্ধকারে বোঝা যায়নি - সকালে শহরটাকে দেখে ওরা বুঝতে পারল মানালি সত্যিই এখনো কিশোরী। বিয়াস নদী অর্ধ-চন্দ্রাকারে ঘিরে রেখেছে মানালি শহরটাকে। নদীর ওপর একটা ব্রিজ পেরিয়ে মূল শহরটায় ঢুকে ছিল ওরা। বাস স্ট্যান্ড থেকে শুরু - পুরো ম্যলটা বড়জোর দেড়-থেকে দু কিলোমিটার লম্বা। ম্যলের ওপরে হোটেল, খাবার দোকান ইত্যাদি - গিয়ে
শেষ হয়েছে একটা তিব্বতি বাজারে। বড় বড় হোটলের পেছন দিকে ছোট ছোট পাহাড়ি অলিগলির মধ্যে
আরো কিছু দোকান পাট। বাড়ীর দেয়াল জড়িয়ে আইভি। বারান্দায় জেরানিয়াম, জংলী গোলাপ, জবা
- ব্যাস ট্যুরিষ্টদের জন্য এইটুকুই মানালী। শহর থেকে একটু দূরে হিড়িম্বার মন্দির। সেই
হিড়িম্বা - যিনি ছিলেন ভীমের সহধর্মিনী। বিয়াস নদী পেরিয়ে যে রাস্তা কুলু থেকে এসে
চলে গেছে আরো উত্তরে রোটাং পাশের দিকে - সেই রাস্তা ওপরেই খানিকটা হেঁটে গেলে Mountaineering
Institute - আশিসের কর্মস্থান।
আজ ওদের প্রথম ছুটি। ভোরবেলা উঠে বাস ধরার তাড়া নেই। আয়েস করে চায়ের
দোকানে বসে কচুরি -জিলিপি খাচ্ছিল ওরা। রিয়াকে টানছে রাস্তার ওপাশের পাইন বন।
পাহাড়ের ঢালে মাইলের পর মাইল জুড়ে পাইন আর ফার দিনের বেলাতেও অন্ধকারে ঢেকে রেখেছে
এক রহস্যময় আদিম পৃথিবীকে। মৃদু বাতাসে, সকালের রোদে ভেসে বেড়াচ্ছে পাহাড়ের গোপন কথা। হোটেল থেকে হেঁটে আসতে আসতে একঝলক
দেখা গেছিল - বিয়াস। পাইন-বনের ওপাশে - রূপোয় মোড়া নর্তকী - দুরন্ত গতিতে বয়ে যাচ্ছে।
অমিতকাকু বললেন - “রিয়া তো Mountaineering Institute যেতে
চাস! আর কেউ যেতে চায় কি? নাহলে আমি ওকে নিয়ে
যেতে পারি।”
রিয়া এটা মোটেও ভাবেনি। হঠাৎ Institute এ গিয়ে ও কি করবে? অদূর সুদূর কোন ভবিষ্যতেই ও হাতেপায়ে দড়ি
বেঁধে কোন দুঃসাহসিক অভিযানে যাবে এরকম কোন সম্ভাবনা নেই।
রুমকি মুচকি মুচকি হাসছে।
সবাই এর ওর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাচ্ছে। রিয়া বলল - “আমি এখন পাইনের বনে হাঁটতে যাব।”
অনেকেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু যেখানেই বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে
হয়। জিনস আর সাদা শার্ট গায়ে, মুখে সকালের রোদ, বাদামী চোখে হাসি মেখে আশিস এই দোকানের দিকেই আসছে।
“Hi! Such a gorgeous morning! So what are your
plans?” বলতে বলতে একটা গরম চা নিয়ে সোজা ওদের টেবিলে
চলে এলো।
“Good Morning. Riya was waiting for you.” তারপর রিয়ার জ্বলন্ত দৃষ্টি
লক্ষ্য করে কিনা কে জানে - অমিতকাকু জুড়ে দিলেন -“We all were! Do you
come here everyday for tea?”
সে কথার অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত অগ্রাহ্য করে আশিস
বলল - “Why don’t you go to Naggar today? Riya you should not miss Roerich’s
paintings. There is a hot-spring there – from the times of Muni Vashistha! Come
I will take you all there.”
Hot
spring তো বক্রেশ্বরেও আছে। অবশ্য বশিষ্ঠ মুনির আশিস-ধন্য কিনা কেউ বলতে পারল না। তবে রোয়েরিখের কাঠের বাড়ী দেখে ওরা মুগ্ধ। আরো মুগ্ধ হল
Nicholas
Roerich এর ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং দেখে। অসামান্য রঙের
খেলা। পাহাড়ে তো রং থাকে না। এখানে রং খুঁজে নিতে হয় আকাশের বুকে - যেমন কাল দেখেছিল
রিয়া। আজ দেখল সেই রঙের গোলায় তুলি ডুবিয়ে পাহাড়, প্রাসাদ, পাখী, ফুল - সবকিছুর ছবি
এঁকেছিলেন এই রাশিয়ান শিল্পী।
সর্বানীমাসী ছবি আঁকেন - বিয়ের আগে একটা বাচ্চাদের স্কুলে ছবি
আঁকা শেখাতেন। খুব খুশি হলেন মিউজিয়াম দেখে। ফেরার সময়ে বললেন - “রিয়ার দৌলতে এটা কিন্তু
আমাদেরও একটা দারুণ প্রাপ্তি! থ্যাঙ্ক ইঊ রিয়া।”
“আমাকে কেন? আশিসকে থ্যাংকস দেওয়া উচিত আমাদের। ”
“Did you like it Riya?”
“Very
much. Thank you so much for this wonderful trip. But didn’t you miss your work
today for us?”
“It was
entirely my pleasure Riya. Let me know whenever you come to Manali. I will show
you many such hidden treasures of the Himalayas.”
যেন রিয়া মাঝে মাঝেই মানালি আসবে!
(৭)
রোটাং পাস যাবার বাস ছেড়েছিল সকাল আটটায়। কিন্তু মানালি ছেড়ে
ঘণ্টা দুয়েক চলে বাস গেল খারাপ হয়ে। এ রাস্তায় কালেভদ্রে বাস চলে। ড্রাইভার কণ্ডাকটার
চেষ্টা করতে লাগল। অন্য সময় হলে যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ হাত লাগায়, কেউ ফোড়ন কাটে,
কেউ তর্কাতর্কি করে। কিন্তু আশ্চর্য্য ভাবে এক্ষেত্রে সেরকম কিছুই ঘটছে না। বাস দাঁড়িয়ে
আছে একটা বাঁকের মুখে। যাত্রীরা এদিকওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কয়েকটা বাঙ্গালী
পরিবার আছে। ভালোই ঠাণ্ডা। সকালের রোদ্দুরে বসে আড্ডা মারছে লোকজন। রিয়া, রুমকি, তুয়া
আর পিকু রাস্তাটা ধরে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখল - বাঁক পেরোলেই এক রূপকথার দেশ! দূরে দূরে দু একটা ছোট- ছোট পাহাড়ি বাড়ী। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে একটা ঝর্ণা। রাস্তার ওপর দিয়েই
তার যাত্রাপথ। বাঁদিকের পাহাড় থেকে নেমে, রাস্তা পেরিয়ে ডানদিকের পাহাড় বেয়ে আবার নেমে
গেছে। আসলে পাহাড় তো একটাই। ওরই নিশ্চিন্ত চলার পথে গোল করে কেটে কেটে তৈরি হয়েছে এই
রাস্তা। এখানে পাইনের জংগল নেই। বরং বড় বড় ঘাস। ঘাসের ভেতর রংবেরঙের ঘাস ফুল। ফুলে
ফুলে মৌমাছি। এতদিন পাহাড়, ঝর্ণা ছিল একটু দূরের- যেন পোশাকি সাজে সাজানো - এখানে আটপৌরে
হিমালয় ওদের ঘিরে রয়েছে - ঝর্ণার জলে পা ডুবিয়ে বসে রইল ওরা।
বেলা হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের কোন গহন কোণায় বাবা আর রজতকাকু আবিষ্কার
করেছেন একটা ঝুপড়ি দোকান - সেখানে মোমো আর থুকপা পাওয়া যাচ্ছে। এক তিব্বতি পরিবারের
রান্নাঘর - উনুনের ওপর বিশাল পাত্রে ফুটছে থুকপা - মাংসের কুচি দেওয়া নুডল-স্যূপ। আর
মাখন দেওয়া গরম চা। অত সুস্বাদু খাবার কোন রেস্তোঁরায় খায়নি ওরা। সেই খাবারের স্বাদ জিভে লেগেছিল অনেক দিন।
রোটাং পাসে বাস পৌঁছল প্রায় দুপুর দুটো। সঠিক বলতে গেলে - রোটাং
পাস অবধি বাস যেতেই পারল না। তার থেকে একটু দূরেই রাস্তা শেষ হয়ে গেল। পীচের রাস্তা
হারিয়ে গেল দিগন্ত-বিস্তৃত বরফের মধ্যে। যেদিকে চোখ যায়, যতদূর চোখ যায় - শুধু সাদা
বরফ। এই শ্বেতসমারোহের সামনে দাঁড়িয়ে সম্মোহিত হয়ে গেল রিয়া। প্রকৃতির এই আশ্চর্য সৃষ্টির
সামনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মাথা নত করতেই হয় মানুষকে। এই বিশালত্বের সামনে প্রতিদিনের ছোট
ছোট দুঃখ-কষ্ট-সঙ্কীর্ণতা হারিয়ে যায়। কয়েক লহমার জন্য হলেও নিজেকে ভুলে রক্তের ভেতর
অনুভব করা যায় মহাবিশ্বকে। এরপর যতবার রিয়া ফিরে গেছে হিমালয়ের বুকে - এই বোধ ওকে আচ্ছন্ন
করেছে। তবে প্রথম প্রেমের মতোই ওই মূহুর্তটা ওর স্মৃতিতে চিরউজ্জ্বল।
ওপরের স্তরের বরফ ঝুরো ঝুরো - নরম। পা দেওয়া মাত্রই পা ডুবে
যাচ্ছে। ধুপধাপ পড়ে যাচ্ছে সবাই। আবার উঠছে - বরফ ছুঁড়ছে একে অন্যের গায়ে। অনাবিল আনন্দে
মেতে উঠল প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া, যুবক-যুবতি, কিশোর-কিশোরীর সকলেই।
মানালিতে
আর একদিন থেকে গিয়েছিল ওরা। অলস দিন ছোট্ট শহরটাতে ঘুরে বেড়িয়ে, তিব্বতি দোকান থেকে
টুকটাক কেনাকাটা করে দুপুরবেলা সবাই ঘরে গেল রেস্ট নিতে। রিয়া যেতে চাইল না। রুমকি,
তুয়া, পিকুরও ইচ্ছে ছিল না এমন সুন্দর দিনে হোটেলের ঘরে গিয়ে ঘুমোতে। ওরা চারজন গেল
পাইনের বনে বেড়াতে। চারজনের কেউই দুরন্ত প্রকৃতির নয়। সময়টাও ছিল অন্যরকম। ছোট্ট পাহাড়ি
শহরটাতে কোন অঘটনের গন্ধ ছিল না - তাই চিন্তা ছিল না কারুর - চারজনের ওপরেই দায়িত্ব
রইল অন্যদের দেখে রাখার -ব্যাস।
পাইন গাছের
ফাঁক দিয়ে দুপুরের রোদ এসে আলপনা দিয়েছে মাটিতে। বাতাসে রজনের গন্ধ। নীল আকাশের বুকে
দুএক টুকরো সাদা মেঘ। ওরা এসে বসল নদীর বুকে পাথরের ওপর। পিকু আর তুয়া মাঝে মাঝে ছোট
ছোট পাথর ছুঁড়ে দিচ্ছিল নদীর বুকে। জলের উচ্ছ্বাসে নুড়ি পাথর হারিয়ে যাচ্ছিল অচিরেই।
এমন অলস বেলা স্কুলের বাচ্চাদের কাছেও বিরল। বড়রা নেই। তাই রিয়া সাহস করে রুমকিকে বলল
- “তুই গান ধর আমিও গাইব” –
“আধেক ঘুমে নয়ন
চুমে স্বপন দিয়ে যায় - শ্রান্ত ভালে যূথীর মালে পরশি মৃদু বায়”।
ওদের গলার সাথে মিলে গেল
ভারী পুরুষকণ্ঠ।
“দিব্যি তো
গাইতে পারিস! তাহলে গাস না কেন?”
“গলায় সুর
নেই যে। তাই এক গান এক সুরে দুবার গাইতে পারি না!”
“আশিসের সাথে
দেখা করতে যাবি না?”
এবার আর রাগ
করতে পারল না রিয়া - হেসেই ফেলল। কে বলে পুরুষ ঈর্ষাকাতর নয়!
(৮)
শিমলা এককালের
সাময়িক রাজধানী হলে কি হবে আপাতত যে কোন পাহাড়ি শহর। মশলা মাখানো মাছভাজা আর আইসক্রিম
খেয়ে, শাল-সোয়াটার কিনে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে ছুটি শেষ। ফেরার ট্রেন কালকা থেকে।
শিমলা থেকে কালকা যাবে ওরা টয় ট্রেনে। জনা
পনেরো লোক বসতে পারে সেই ট্রেনে।
রিয়ার আর রুমকি বসেছে একসাথে। ওদের উল্টোদিকে অমিত একা। কিছু
কিছু লোক আজন্ম একা। বড় বড় কাঁচের জানলা দিয়ে পাহাড় প্রায়
ঢুকে পড়ছে ট্রেনের ভেতর। মনে হচ্ছে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। মাঝে মাঝেই ট্রেন ঢুকে
পড়ছে টানেলের ভেতরে। গহন অন্ধকার থেকে যখন বেরোচ্ছে, শেষ বিকেলের আলো মাখা মায়াবী সবুজ
চেতনায় আছড়ে পড়ছে অপার্থিব মূর্ছনায়। সন্ধ্যে নামছে ধীরে ধীরে। বিষণ্ণ গোধূলিতে মিশে যাচ্ছে গেল অমিতের গানের কলি -
“তোমারই ধেয়ানে ক্ষণে ক্ষণে
কত কথা জাগে মোর মনে
কে তুমি ফাগুনের ছবিটি আঁকো
কেন দূরে থাকো - শুধু আড়াল রাখো ...”
অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চরাচর। হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়। ট্রেন যখন
পৌঁছবে কালকায় - বিজলি বাতির উজ্জ্বল আলোয় এই কদিনের স্মৃতি রূপকথা হয়ে যাবে। দিনের শেষে ক্লান্ত চোখে স্বপ্নের ভেতর ভাসবে বরফঢাকা পাহাড়চূড়া, হ্রদের জলে তিরতির করে কাঁপবে চিনারের পাতা, রজনের গন্ধ উড়বে হাওয়ায়
- সোনার কাঠি খুঁজে ফিরবে রূপকথার রাজকুমার।
No comments:
Post a Comment